আমি কখনও রাজনীতির সাথে ছিলাম না উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছেন, আমার কখনও মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছিল না। সবসময়ই একটা জিনিসে বিশ্বাস করে মানুষের সেবা করতে চাই। ধর্মে রয়েছে ‘জীবে দয়া করে করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। আর ডাক্তার হয়ে মানুষের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করতে চাই।
সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই’র এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, আমি আগে শুধুমাত্র পোড়া রোগের চিকিৎসা করতাম। সেই বিভাগে আমি সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে পুরো দেশের স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে এখন স্বাস্থ্যখাতের সকল দিক বিবেচনা নিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিষয়ে আমি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করি। আমি কখনও এটি প্রশ্রয় দেইনি এবং নিজেও এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম না। প্রধানমন্ত্রীও আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যখাতের সকল দিক দুর্নীতি মুক্ত করতে যা যা করা প্রয়োজন আমি যেন করি। তিনি সবসময়ই আমার পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়াও স্বচ্ছ নিয়োগ নিয়ে কাজ করতে যাচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরে এরই মধ্যে আমার নির্দেশনা পৌঁছে গিয়েছে, আমার আমলে কোনভাবে যেন দুর্নীতি বা অস্বচ্ছতার নিয়োগ না হয়। যোগ্য ব্যক্তি সঠিক পদ্ধতিতে নিয়োগ পাবার লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্যখাতের সকল দুর্ঘটনার জন্য সামন্ত লাল সেন দেশবাসীর নিকট ক্ষমা চেয়ে বলেন, এসব ঘটনার দায়ভার আমার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত অভিযান হচ্ছে এবং সামনেও চলবে। সকল ক্লিনিকের সঠিক তথ্য, পরিবেশ এবং মান বিশ্লেষণ করে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এসব অভিযানে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতাও চেয়েছেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, আমার কখনও টাকা আয় করা কিংবা সম্পদ গড়ার লক্ষ্য ছিল না। আমি সবসময়ই মানুষের সেবা করতে চেয়েছি। ডাক্তার হওয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। আর মন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে তো কখনো কল্পনাও করিনি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন, মানুষের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতকে নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন, আমি দেশের এই খাতকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।
এসময় তিনি স্বাস্থ্যবিমা’র বিষয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যবিমা রয়েছে। আমাদের দেশ এটি নিয়ে কাজ করবে। তবে তার আগে স্বাস্থ্যখাতে কিছু মৌলিক সমস্য রয়েছে সেগুলো নিয়ে কাজ করতে চাই।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে ডাক পান জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটগুলোর সমন্বয়ক অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন। সেদিনের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রিসভা সচিবের কল পেয়ে বেশ আশ্চর্য হয়েছিলেন তিনি।
সামন্ত লাল সেন বলেন, ফোন পাওয়ায় আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম। বার্ন নিয়ে আমি কাজ করি। সেখানে নতুন করে আবার একটা দায়িত্ব, দেশের স্বাস্থ্যখাত আমার কাধে। ভাবতেও সেদিক অবাক লাগছিল।

হবিগঞ্জের সন্তান ও এশিয়ার বিখ্যাত বার্ন স্পেশালিস্ট হিসেবে সমধিক পরিচিত সামন্ত লাল সেন। এর বাইরে তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। এ ছাড়া কখনো রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না তিনি। ফলে মন্ত্রী হওয়ার খবরে কিছুটা অবাক হয়ে পড়েছিলেন ডা. সামন্ত লাল সেন।
সামন্ত লাল সেন ১৯৪৯ সালের ২৪ নভেম্বর হবিগঞ্জের নাগুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম জিতেন্দ্র লাল সেন, যিনি সরকারি চাকরি করতেন। তিনি সেন্ট ফিলিস হাইস্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে মাধ্যমিক ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। ১৯৮০ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে ‘ডিপ্লোমা ইন স্পেশালাইজড সার্জারি’ ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে জার্মানি ও ইংল্যান্ডে সার্জারিতে আরও প্রশিক্ষণ নেন।
সামন্ত লাল সেন এমবিবিএস পাশ করার পর ১৯৭৫ সালে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ঢাকায় বদলি হয়ে শহিদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেন।
ডা. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে ঢাকা মেডিকেলে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম বার্ন বিভাগ চালু হয়। সামন্ত লাল সেন এই বিভাগ চালু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে ২০০৩ সালে বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারির জন্য স্বতন্ত্র একটি ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
তিনি এ ইউনিটের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। পরে সরকার তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে নিয়োগ দেন।
পরে এই ইউনিটটিকে স্বতন্ত্র একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তর করে ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’ নামে ২০১৯ সালের ৪ জুলাই এখান থেকে চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু হয়। শুরু থেকেই সামন্ত লাল সেনের প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পান।








