একজন দক্ষ গীতিকারের লেখা শুধু শ্রুতিমধুরই নয়, তা শ্রোতার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তেমনই একজন গীতিকার সোমেশ্বর অলি। তার লেখার জাদুতে গান পায় প্রাণ, আর সুরের সঙ্গে মিলেমিশে সৃষ্টি হয় এক অনন্য অনুভূতির জগৎ। সিনেমায় অলির গান মানেই অন্যরকম ব্যাপার! ‘প্রিয়তমা’য় ঈশ্বর, ‘ওমর’র ‘রব জানে’ সর্বশেষ ‘বরবাদ’-এ মহামায়া— এই গীতিকারের লেখা প্রতিটি গানই পেয়েছে শ্রোতাপ্রিয়তা। চ্যানেল আই অনলাইনের নির্ধারিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন জনপ্রিয় এই গীতিকবি-
আপনি কি কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা বা ঘটনা থেকে প্রভাবিত হয়ে গান লেখেন?
ঘটনা বা অভিজ্ঞতা যে কারো কাজের মধ্যেই প্রভাব রাখে। কেউ কী ভাববে, কতদূর ভাবতে পারবে, কতটুকু ভিন্নভাবে ভাববে- সেটারই প্রতিফল তার সৃষ্টিকর্মে থাকে। বিশেষ করে লেখালেখির ক্ষেত্রে তা বৈচিত্রপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
এমন কোনো লাইন কি এই জীবনে লিখেছেন যা নিজে পড়েই কেঁদে ফেলেছেন? যদি থাকে, সেটা কোন গান?
আমার সহজে কান্না পায় না। তবে আবেগাক্রান্ত হই, হাহাকার বোধ করি। এমন অনেক লাইনই হয়তো লিখেছি, সেটিও বুঝতে পারি অন্যদের মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর। এ ছাড়া নিজের কোন লেখাটা কতখানি অন্যকে স্পর্শ করবে, ভাবাবে- সেটি কিছুটা অনুমান করতে পারি। ‘আপনার অমুক গান শুনে কান্না করে দিয়েছি’- এমন মন্তব্য প্রায়ই শুনতে পাই। শুনে ভাবি, ‘আহা, মানুষের মন কতো নরম…!’
ইতিমধ্যে সিনেমায় আপনার লেখা বেশকিছু গান মানুষের মুখে মুখে। যদি আপনার কোনো গান ভবিষ্যতে দশ/বিশ বছর পরও মানুষ গাইতে চায়, আপনি চান সেটা কোন গানটা হোক? কেন?
কেউ বলতে পারে না, দশ-বিশ বছর পর মানুষ আজকের কোনো গান গাইবে কি-না, মনে রাখবে কি-না। ‘ঘুড়ি তুমি কার আকাশে ওড়ো’ লিখেছিলাম ২০০৫ সালে, ২০১১ সালে সেটি মুক্তি পায়, তখন কী ভেবেছি ২০২৫-এ এসে এই গান নিয়ে কেউ কথা বলবে! ভাবি নি। কাজেই এখন যা লিখছি, সময়ের প্রয়োজনে লিখছি, ভবিষ্যতে কী হবে ভাবি না।
কোনো গায়ক বা গায়িকাকে মাথায় রেখে কি কখনো কোনো গান লিখেছেন? নাকি গান লেখার পরই ভাবেন কে গাইবেন?
প্রক্রিয়াটা কয়েকটা ধাপে ঘটে। আমি সাধারণত লেখার কাজটা সেরে নির্ভার থাকার চেষ্টা করি। কখনো কখনো তা পারি না, সম্ভব হয় না, সংশ্লিষ্টরা ইনভলব করে ফেলে। যেমন ‘বরবাদ’-এর ‘মহামায়া’র শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, এই গানের জন্য নোবেলই বেস্ট চয়েস। সংশ্লিষ্টরাও এক কথায় সায় দিয়েছিলেন।
সিনেমার জন্য যখন গান লেখেন, তখন কি নিজের কল্পনার চেয়ে চরিত্রের চোখে পরিস্থিতিটা দেখতে চেষ্টা করেন? মানে নিজের ভেতর যে ‘গীতিকার সত্ত্বা’ আছে, তাকে কি তখন একটু ধামাচাপা দিয়ে রাখতে হয়?
একটি নাটক বা সিনেমা সাধারণত একবারই দেখা হয়। কিন্তু তাতে ব্যবহৃত গানগুলোর আবেদন কী একবার দেখা-শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? না। গানগুলোর আবেদন গল্পের চরিত্রকে ছাপিয়ে শ্রোতার অনুভূতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে বলেই আমরা পুরনো দিনের সিনেমার গানগুলোকে মনে রেখেছি। আমি যখন লিখি, অবশ্যই প্লট, গল্প, চরিত্র, ঘটনাপ্রবাহ মাথায় রেখে লিখি, আবার এটাও ভাবি, যে কেউ যেন এর সঙ্গে নিজের ‘কিছু একটা’ খুঁজে পায়, সিনেমাটা না দেখলেও…
‘ঈশ্বর’ কিংবা ‘মহামায়া’- গানগুলো লেখার সময় আপনার কি কখনো মনে হয়েছে- কোনো অনুভূতি শব্দে পুরোটাই ধরতে পারছেন না? এমন পরিস্থিতি তৈরী হলে কী করেন?
-না। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। অনুভূতিকে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না- এমন অনুভূতি কমই আছে। সবকিছুই ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। তবে কিছু কিছু মূহুর্তের অনুবাদ করা সত্যি জটিল কাজ। আর এটা ঠিক যে, কোনো কোনো গান লেখার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কাঁটাছেঁড়া করতে হয়, বেগ পেতে হয়, ভোগান্তি পোহাতে হয়…। এটি কাজেরই অংশ, ব্যাপার না।
দেশের সুপারস্টার আপনার লেখা গানে ঠোঁট মেলাবেন- এমনটা ভেবে কি কখনো গানের উপর জোরজবরদস্তি করেছেন?
-জোরজবরিদস্তি! একদমই না। কোনো লেখার ওপরই জোর খাটানো যায় না। পেশাদারিত্ব মাথায় রেখেই লিখি। বড় বা ছোট তারকা বলে আলাদা করে কিছু লেখা যায় কি? আমি পারি না। কোনো গানে শাকিব খান আছেন, এটি অবশ্যই বাড়তি পাওনা, বাড়তি চাপ না…
নিকট অতীতে আপনার কি কোনো গান শুনে এমন মনে হয়েছে যে- ‘এমন একটা গান যদি লিখতে পারতাম’! সেটা যে কোনো ভাষার গান হতে পারে… নাম বলবেন?
অনেক কাজ দেখে আফসোস হয়, এটা ঠিক। নিজের বেলায়ও এমনটা ঘটে, যখন একটি গানের সবগুলো দিক পরিপূর্ণভাবে কাজ করে না। সত্যি বলতে, আমরা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করি। এর মধ্যেও যে ভালো ভালো কিছু হচ্ছে, এটাই অনেক।
নরমালি আপনি যা বলার সাহস করেন না, কিন্তু গানের কথায় তা-ই আপনি বলে ফেলতে পারেন? গান লেখা শেষ হলে এমন অনুভূতি কি আপনার হয়েছে কখনো?
-প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ নিয়ে সাহসী কথা বলার সুযোগ কম। তবে নতুনভাবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে। সেটি হয়তো কিছু কিছু ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর করতে পারছি…








