২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২৫ তারিখ, এক রোববার সকালে আমাদের বাসায় সাজ সাজ রব পড়ে গেল! বিশালদেহী কিছু আমেরিকান নিরাপত্তারক্ষী তন্ন তন্ন করে বাসার আশপাশ দেখে নিরাপত্তা নিশ্চিত করলো।
তখন আমি থাকি নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকায়। পুরো ঠিকানা- ১৪৮-০১, ৯০ এভিনিউ, জ্যামাইকা, নিউইয়র্ক ১১৪৩৫। হুমায়ূন আহমেদ এর কর্কট রোগের সাথে যুদ্ধরত আমাদের পুরো পরিবার। ডাক্তার আর হাসপাতাল এর বাইরে মাঝে মাঝে বিকেলে ম্যানহাটনে ‘ইস্ট’ নদীর পাড়ে বসে সময় কাটান হুমায়ূন আহমেদ। কেমোথেরাপি চলছিল নিয়মিত।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বেশি মানুষের সংস্পর্শে আসা নিষেধ। তার উপরে কেমোর প্রভাবে মাথার চুল পরতে শুরু করেছে! কমে যাওয়া চুল নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত না হলেও আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তিতে ভোগেন হুমায়ূন আহমেদ। অস্বস্তি ঢাকতে একখানা টুপি কিনে নিয়েছেন তিনি। বাড়ির বাইরে গেলে টুপিটা মাথায় দিয়ে বের হন।
সেদিনও ব্যস্ত নিরাপত্তা রক্ষীদের দেখে টুপি বের করলেন তিনি। জ্যামাইকার ঐ বাড়ির আশেপাশে বেশ অনেক বাঙালিদের বসবাস। তাদের জানালা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে আমাদের বাড়ির কর্মতৎপরতা দেখছেন তারা। আমার বড়পুত্র খানিকটা অবাক- কে আসবে বাসায়! হুমায়ূন উত্তর দিলেন বাংলাদেশ থেকে ভালোবাসা নিয়ে আসবেন একজন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী মমতাময়ী শেখ হাসিনা।
সাড়ে চার বছর বয়সী পুত্র নিষাদ কিছু বুঝতে পারলো কিনা জানি না। তবে সদ্য এক বছর পূর্ণ হওয়া নিনিত গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বাবার কোলে চেপে বসলো। দুপুর ১২ টা নাগাদ প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালেন। তাঁকে স্বাগত জানালেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ শাদা ফুল তুলে দিলেন হুমায়ূনের হাতে। তারপর ছোট্ট বসার ঘরটিতে বসলেন তিনি।
একজন বড়বোনের মতোই হুমায়ূন আহমেদ এর শারিরীক অবস্থার সব খবরাখবর নিলেন প্রধানমন্ত্রী। হুমায়ূন আহমেদও জানালেন চিকিৎসার সব তথ্য আর চিকিৎসকের মতামত। আমি পাশের চেয়ারে বসে বোকার মতো তাকিয়ে আছি আর অবাক বিস্ময়ে ভাবছি “ইনিই কি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী! তাঁর প্রানোচ্ছল হাসি, তাঁর মমতাময় দৃষ্টি, কোনোরকম পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী ছাড়াই দেশের একজন লেখকের দুঃসময়ে তাকে দেখতে যাওয়া! এসব কি কোনো সরকার প্রধানের কাছে কোনোদিন আশা করবার কল্পনা করতে পেরেছি আমরা!”
বাকপটু হুমায়ূন আহমেদ খুব সাধারণ ভঙ্গিমায় কথা বলা এই অসাধারণ মানুষটিকে সামনে পেয়ে কেমন যেন অপ্রভিত, অপ্রস্তুত। জাতিসংঘের অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে অংশ নিতে আসা ব্যস্ততম একজন রাষ্ট্রপ্রধান নগন্য এক লেখকের বাড়িতে!
“কতো জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকেন আপনি। আপনার নিশ্চয় দেরি হয়ে যাচ্ছে?”- জবুথবু হুমায়ূন বলে বসেন! কিশোরীসুলভ একটা হাসি খেলে যায় প্রধানমন্ত্রীর চোখে, মুচকি হেসে বলেন, “আমাকে কি তাড়াতাড়ি চলে যেতে বলছেন আপনি?” অপ্রস্তুত হুমায়ূন হেসে ফেলেন।
প্রায় ৩০ মিনিট থাকলেন তিনি। আমাকে বললেন যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, যেকোনো বিপদে যেন তাঁকে জানানো হয়। সবরকম সহযোগীতার আশ্বাস দেন তিনি। যাওয়ার সময় দশ হাজার ডলারের চেকসহ একটি খাম তুলে দেন হুমায়ূন আহমেদের হাতে। লজ্জায় পড়ে যান হুমায়ূন। তার অস্বস্তি দেখে আমি বলি “তুমি খামটা হাতে নাও। এখানে আছে তোমার জন্য প্রধানমন্ত্রী আর দেশের মানুষের দোয়া।”
বিনয়ের সঙ্গে চেকটি নেন হুমায়ূন আহমেদ। আমার ছোট্ট দুই পুত্রের মাথায় হাত রেখে আদর করে বিদায় নেন মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী।
কোলন সার্জারীর আগে ২০১২ এর মে মাসে শেষবারের মতো যখন দেশে এসেছিলেন তখন প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেন লেখক নিজে। আমার মা বেগম তহুরা আলী তখন নবম জাতীয় সংসদের একজন সদস্য। তার মাধ্যমে লেখকের আগ্রহের কথা জেনে একদিন বিকেলে নিজ বাসভবনে সময় দেন প্রধানমন্ত্রী।
লেখক এবার স্বপ্রভিত। মমতাময়ী মানুষটির জন্য সুদূর কলোরাডো থেকে কিনে এনেছেন উপহার। বেগুনী রঙের উজ্জ্বল একটুকরো ‘এমিথিস্ট’ পাথর। পাথরের ওপরের অংশ শক্ত আবরণে ঢাকা। তার ফাঁক দিয়ে ভেতরের বেগুনী আভার উজ্জ্বলতা ঠিকরে বেরোচ্ছে!
শুভ্র শাদা শাড়ীতে বসার ঘরে এসে নেত্রী যখন ঘরোয়া ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন “কেমন আছেন হুমায়ূন সাহেব?” তখন আর তাঁকে সরকার প্রধান মনে হয় না, পরমাত্মীয়ের মতো লাগে!
তাঁর জন্য আনা উপহার হাতে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, “এই পাথরটা দেখে আমার আপনার কথা মনে হয়েছে। এই পাথরটা যেমন বাইরে অনেক কঠিণ কিন্তু আলো পড়লেই ভেতরের ঔজ্জ্বল্য দৃশ্যমান তেমনি চারপাশের কঠিণ আবরণ আপনার ভেতরের উজ্জ্বলতাকে আটকে রাখতে পারে না, একটু আলোতেই ঝলমলিয়ে ওঠে।”
তিনি পরম যত্নে উপহার গ্রহণ করলেন। অন্দরমহল থেকে আসা বিভিন্ন ঘরোয়া নাস্তা দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। কার্পেটে বসে দেড় বছর বয়সী নিনিতকে নিজ হাতে চিকেন কাটলেট টুকরো করে কেটে খাওয়ালেন!
আমি আজও বিস্মিত হয়েভাবি- দেশের সর্বোচ্চ আসনে আসীন মানুষটির এধরনের সহজ আদুরে ব্যবহারের কথা! ঠিক নিজ নাতি নাতনির মতোই কোলে তুলে নিয়েছিলেন ছোট্ট নিনিতকে! আর নিষাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “কি… তুমি নাকি নিউইয়র্কে তোমার জন্য গিফট না নিয়ে যাওয়ায় আমার উপর ‘লাগ’ করেছো! এইনাও তোমার গিফট।”
খানিক আগেই ভেতর থেকে একজন সুন্দর কাগজে মোড়ানো তিনটি বাকসো কেন যে নিয়ে এসেছে তা ততক্ষণে বোঝা গেল! হুমায়ূন আহমেদ তার ‘নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’ বইটিতে প্রধানমন্ত্রীর জ্যামাইকার বাসায় আগমন নিয়ে এসেছিলেন।
শিরোনামের একটি কলামে উপহার না পেয়ে নিষাদের ‘লাগ’ করার কথা লিখেছিলেন। তার ফলাফল স্বরূপ আমার দুই পুত্র দুইখানা খেলনার বাকসো উপহার পেলো। আচ্ছা ছয় মাস আগে দেখে আসা ছোট্ট একটি বাচ্চার অভিমান (বাচ্চাটির ভাষায় ‘লাগ’) একজন প্রধানমন্ত্রী মনে রাখতে পারেন! সেই বাচ্চার সাথে বাচ্চাদের মতো মিশে গিয়ে প্যাকেট খুলে খেলনা বের করে খেলতে পারেন! পারেন। বাংলাদেশের রূপকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারেন।
তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট জয়ে শিশুদের মতো হাততালি দিয়ে উৎফুল্লতা প্রকাশ করতে পারেন! জাতীয় সংগীতের সাথে জোরে গলা মেলাতেও পারেন।








