পুরো নাম শাজি নীলাকান্তন করুণাকরণ। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই স্বপ্নদ্রষ্টা শাজি এন করুণ নামেই ছিলেন সুপরিচিত। ৭৩ বছর বয়সে সোমবার (২৮ এপ্রিল) কিংবদন্তী এই চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক প্রয়াত হয়েছেন। তার মৃত্যুতে ভারতীয় সিনেমায় শোকের ছায়া।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে, শাজি তিরুবনন্তপুরমে নিজ বাড়ি ‘পিরাভি’-তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জানা গেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এবং সোমবার সকাল থেকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
শাজি এন করুণের হাত ধরেই মালায়ালাম চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণকারী শাজি এন করুণ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরে মালায়ালাম সিনেমাকে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যান।
তিনি পড়াশোনা করেন পল্লিকারা স্কুল ও তিরুবনন্তপুরম ইউনিভার্সিটি কলেজে। পরে পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন এবং ১৯৭৫ সালে চিত্রগ্রহণে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। মাদ্রাজে কিছুদিন থাকার পর তিনি কেরালা স্টেট ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনে ফিল্ম অফিসার হিসেবে যোগ দেন।
এই সময়ে তিনি প্রখ্যাত পরিচালক জি অরবিন্দনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও কেজি জর্জ এবং এমটি বাসুদেবন নাইয়ারের মতো গুণী পরিচালকদের সিনেমায় চিত্রগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেন।
শুধু চিত্রগ্রহণই নয়, নির্মাণ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তার প্রথম ছবি পিরাভি (জন্ম)। ১৯৮৯ সালের এই মালায়ালাম চলচ্চিত্র যা বেশ কয়েকটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছিল। প্রথম সিনেমা দিয়েই বিশ্ব চলচ্চিত্রে জায়গা পেয়েছিলেন শাজি। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সার্কিটে অন্যতম প্রধান ভারতীয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
এক হারিয়ে যাওয়া ছেলের জন্য একজন বাবার অন্তহীন অপেক্ষার গল্প দেখিয়ে ‘পিরাভি’ সিনেপ্রেমীদের প্রশংসার পাশাপাশি কান চলচ্চিত্রসহ আরও অনেক সিনে উত্সবগুলিতে প্রায় ৭০ টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার জেতে। স্বীকৃতির মধ্যে রয়েছে এডিনবরায় চার্লি চ্যাপলিন পুরস্কার, লোকার্নোতে সিলভার লেপার্ড পুরস্কার, কানে ক্যামেরা ডি’অর স্পেশাল মেনশন, শিকাগোর সিলভার হুগো এবং ১৯৮৯ সালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের জন্য ভারতের প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল পুরস্কার!
‘পিরাভি’র পর যে ক’টি সিনেমা পরিচালনা করেছেন, কখনোই চলচ্চিত্রের নান্দনিকতার সাথে আপস করেননি শাজি। তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সিনেমা স্বহম (১৯৯৪) এবং বনপ্রস্থম (১৯৯৯) কানের মূল প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হয়। তার হাত ধরেই মালায়ালাম ভাষার কোনো সিনেমা কানের মূল প্রতিযোগিতায় স্থান করে নেয়।
২০১০ সালে মামুট্টি অভিনীত ‘কুট্টি স্রাঙ্ক’ ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১০-এ সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছিল এবং কেরালায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার পাশাপাশি ৪৫ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছিল।
তার শেষ ছবি ‘ওলু’ – একটি ফ্যান্টাসি ফিল্ম। ২০১৮ সালে আইআইএফআই-তে ভারতীয় প্যানোরামার উদ্বোধনী সিনেমা হিসেবে এবং অন্যান্য বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উৎসবে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিল।
২০১০ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করুণ কেরালা স্টেট ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ২০২৩ সালে জে সি ড্যানিয়েল অ্যাওয়ার্ড – কেরালা সরকারের সিনেমায় সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন এবং ১৯৯৮ সালে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত কেরালার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম স্থপতি ছিলেন।
সোমবার মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী অনসূয়া দেবকি ওয়ারিয়র এবং দুই সন্তান—অপু করুণ ও করুণ অনিল—কে রেখে গেছেন। শাজি এন করুণের প্রয়াণে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ এক মহান শিল্পীকে হারাল।








