গিনি-বিসাউয়ে সদ্য ঘটে যাওয়া সামরিক অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়—এটি একটি বহুস্তরীয় রাজনৈতিক সংকট, দুর্বল রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং দীর্ঘদিনের অস্থিরতার ফল। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের প্রভাবের মধ্যে জর্জরিত। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। যখন ফল ঘোষণার আগেই সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তার করে।
সীমান্ত বন্ধ, কারফিউ জারি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত করার মাধ্যমে তারা দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পালাবদল নয়; বরং গিনি-বিসাউ রাষ্ট্রের দুর্বল প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসনের অভাব এবং গণতন্ত্রের সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন—এই সামরিক হস্তক্ষেপ দেশকে স্থিতিশীলতা দেবে, নাকি আবারও অরাজকতার নতুন অধ্যায় তৈরি করবে?
নির্বাচন ও দুই নেতার বিজয় ঘোষণা
২৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে গিনি-বিসাউয়ে একযোগে রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ৩ হাজার ৭২৮টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ৯ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটার ভোটদান করেন। মোট ১১ জন প্রার্থী রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালো এবং স্বাধীন প্রার্থী ফার্নান্দো দিয়াস ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত।

তবে নির্বাচন শুরুর আগেই বিতর্ক তৈরি হয়, কারণ প্রধান বিরোধী দল পিএআইজিসি ও তার নেতা ডোমিঙ্গোস সিমোয়েস পিরেইরাকে প্রার্থিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়, যা নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য ও পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা ওঠে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রথম দফায় কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পেলে পুনঃনির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ফল ঘোষণা হওয়ার আগেই রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়।
উমারো সিসোকো এমবালো এবং স্বাধীন প্রার্থী ফার্নান্দো দিয়াস উভয়েই নির্বাচনের পরই নিজেদের জয়ী দাবি করেন। সাধারণত নির্বাচন কমিশনের তরফে ফল ঘোষণার জন্য কিছু সময় লাগা উচিত ছিল; কিন্তু একটি তীব্র রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা-বিষয়ক সংকট সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত করে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত করে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল
ভোটের মাত্র তিন দিন পর সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত করে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেয়, যা একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে সরাসরি সামরিক অভ্যুত্থানে রূপ দেয়।২৬ নভেম্বর ২০২৫ রাজধানী বিসাউয়ে গুলির শব্দ শোনা যায় প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, নির্বাচন কমিশন ভবন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংলগ্ন এলাকায়। সেনাবাহিনীর কিছু ইউনিট দ্রুত সেখানে অবস্থান নেয়। একই দিন, সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে ঘোষণা করে যে তারা সব নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে।
তারা টেলিভিশনে এক লিখিত বিবৃতিতে নিজেদের ‘উচ্চ সামরিক কমান্ড’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তারা বলেছেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর কাজ করবেন সেনাবাহিনী। ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘোষণা করে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে, সব সীমান্ত (স্থল, নৌ ও আকাশ) বন্ধ থাকবে, রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হবে এবং গনমাধ্যম ও মিডিয়ার কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করা হবে।

অফিসে বসা অবস্থায় গ্রেফতার এমবালো
সেনাবাহিনী যখন গিনি-বিসাউতে ক্ষমতা দখল করে, তখন প্রেসিডেন্ট উমারো সিসোকো এমবালোকে তার অফিসে বসা অবস্থায় গ্রেফতার করা হয় এবং এটি সম্পূর্ণ সহিংসতা ছাড়াই সংঘটিত হয়। তাদের হস্তক্ষেপের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দ্রুত নিজেদের হাতে নেওয়া হয়। পরবর্তী দিন, ২৭ নভেম্বর ২০২৫-এ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে একটি শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যার মাধ্যমে হোর্তা ইন্টা-আনা ম্যান-কে রাষ্ট্রীয় সংস্থার (জান্তা) অস্থায়ী প্রধান হিসেবে শপথ করানো হয় এবং এভাবে গিনি-বিসাউতে সামরিক শাসন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, যা দেশটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংবিধানগত শূন্যতাকে আরও গভীর করে তোলে।
কেন সামরিক অভ্যুত্থান?
গিনি‑বিসাউয়ে সামরিক অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দারিদ্র্য এবং অপরাধ ও মাদক চক্রের জটিলতার একটি নতুন অধ্যায়ের প্রকাশ। দেশটির ইতিহাস দেখালে বোঝা যায়, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াই এখানে প্রায়শই সেনা হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান হয়ে এসেছে।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সাংবিধানিক অস্বচ্ছতা এই অভ্যুত্থানকে সহজ করেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে গিনি‑বিসাউর সংসদ কার্যত স্থগিত ছিল। বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন সংস্থাগুলোর নেতৃত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংবিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার অভাব ছিল। এমন একটি প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সামরিক হস্তক্ষেপে রূপ নিতে খুব বেশি সময় নেয়নি।

২০২৫ সালের রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান ঐতিহ্যবাহী বিরোধী দল পিএআইজিসি এবং তার নেতা ডোমিঙ্গোস সিমোয়েস পিরেইরাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রধান বিরোধীদল ছাড়া সম্পন্ন হওয়ার কারণে নির্বাচনকে বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এর ফলে নির্বাচন যদিও গণভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার সত্যিকার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই কমে যায়।
মাদক চক্রের কেন্দ্র
এছাড়া, গিনি‑বিসাউ বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দুর্বল প্রশাসন, অর্থনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে মাদক চক্রের প্রভাব রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে জটিলভাবে যুক্ত। সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তাদের কাছে এমন তথ্য ছিল, যেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মাদক চক্র একত্র হয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিকৃত করার চেষ্টা করছিল। যদিও এই অভিযোগ এখনো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি, তা সামরিক হস্তক্ষেপের একটি যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা
গিনি‑বিসাউর ইতিহাসও বারবার অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী। ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সেনা–রাজনৈতিক সংঘাত, বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে। ১৯৮০, ২০০৩, ২০১২ সহ বহুবার সেনা হস্তক্ষেপ ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতার কারণে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বারবার বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালের অভ্যুত্থান গিনি‑বিসাউর জন্য নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। তবে এটি স্থায়ী শৃঙ্খলা আনবে কি না, নাকি আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, তা এখনও অনিশ্চিত। বর্তমান সামরিক শাসনের গ্রহণযোগ্যতা জনগণের মধ্যে সীমিত হতে পারে। শুধু সেনা নিয়ন্ত্রণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন সংস্থা, গণমাধ্যম স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার পুনর্গঠন করা না হলে সমস্যার মূল মূলে প্রভাব ফেলতে পারবে না।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও চাপ
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ও চাপও গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সমাজ সংবিধান ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করতে পারে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, দারিদ্র্য, অপরাধ এবং রাজনৈতিক বিভাজন পরিস্থিতি সহজ করে না। যদি মাদক চক্র এবং অপরাধী প্রভাব ভেঙে না দেওয়া হয়, দেশ আবার ন্যারকো-রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে পারে এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থবির হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, গিনি‑বিসাউর ভবিষ্যৎ কেবল সেনা বা রাজনীতির উপর নির্ভর করবে না। এটি নির্ভর করবে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও অধিকার সংস্থার সচেতন অংশগ্রহণের উপর, যারা গণতন্ত্র ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক সংস্থার সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ, যারা সংলাপ, পর্যবেক্ষণ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারের এবং সেনাশাসিত পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও সংস্থাগত সংস্কার আনা এবং সমাজের দুর্বল অংশের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।








