প্রায় ছয় দশক পর ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক হিসাব, বিশেষ করে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে ঘিরে উদ্ভূত নতুন সমীকরণ।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই আবুধাবি ও রিয়াদের মধ্যে তেলের উৎপাদন কোটা নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। ওপেকের নীতিমালায় উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে আমিরাত বেশি তেল উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছিল না, যা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছিল।
বিশ্লেষক ফিরাশ মাকসাদ বলেন, আমিরাত নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে চাইলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন নীতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছিল না।
আমিরাতের অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ পাকিস্তান। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের দুর্বল ভূমিকা আবুধাবিকে বিরক্ত করেছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক নিল কুইলিয়াম মনে করেন, আমিরাত বর্তমানে আঞ্চলিক রাজনীতিকে ‘সাদা-কালো’ দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে, যেখানে নিরপেক্ষ অবস্থানকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের আমানত প্রত্যাহারও করেছে আমিরাত, যা দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমিরাত সরাসরি হামলার ঝুঁকিতে পড়ে এবং শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমিরাত চেয়েছিল আঞ্চলিক জোটের শক্ত প্রতিক্রিয়া, কিন্তু গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিলের মধ্যে সে ধরনের ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।
উল্লেখ্য ১৯৬৭ সালে ওপেকে যোগ দেওয়া আমিরাত এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদকদের একটি। সংগঠন ছাড়ার ফলে তারা উৎপাদন কোটা থেকে মুক্ত হয়ে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে পারবে। এই সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের জন্যও একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে তেলের দামের ওপর রিয়াদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমিরাতের এই সিদ্ধান্তের ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে নমনীয়তা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে দাম কমতে পারে। এতে বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশ, যাদের জ্বালানি ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমিরাতের ওপেক ত্যাগ শুধু তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে, বরং আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।


