হিন্দি সিনেমার ইতিহাস সাজানো অসংখ্য কিংবদন্তী সুরকারে নওশাদ, এস.ডি. বর্মন এবং আর.ডি. বর্মন, মদন মোহন, ও.পি. নায়্যার, হেমন্ত কুমার, শংকর-জয়কিশান, কল্যাণজি-আনন্দজি, লক্ষ্যীকান্ত-পেয়ারেলাল, রোশন—আরও কত নাম! সেই দীর্ঘ তালিকায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন সলিল চৌধুরী। তিনি শুধু অসাধারণ সুরকারই নন, ছিলেন লেখক, কবি, নাট্যকর্মী এবং দৃঢ় বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন চিন্তক।
১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর জন্ম নেন ‘সলিল দা’! তাঁর শৈশব কেটেছে আসামের চা-বাগানে। চিকিৎসক বাবার সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্য ধ্রুপদি সংগীত আর স্থানীয় বাংলা-আসামি লোকসংগীতের মিশ্র পরিবেশ তাঁকে গড়ে তুলেছিল এক অনন্য সংগীতশিল্পীতে, যাঁর ধারা ছিল সমসাময়িকদের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।
সিনেমা, নাটক এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাঁচ দশকের অসামান্য যাত্রার পর ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হন কিংবদন্তী সুরকার সলিল চৌধুরী। বুধবার (১৯ নভেম্বর) তার জন্মশতবর্ষ। বিশেষ এই দিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর দীপ্ত এক জীবনকে-
রাজনীতির মানুষ
যুবক বয়সেই সলিল চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেন ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ বঙ্গ-দুর্ভিক্ষ। সেই সময়টাই তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দেয়। তাঁকে টেনে আনে কমিউনিস্ট মতাদর্শে এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (আইপিটিএ)-এর সক্রিয় কর্মী হিসেবে যুক্ত করে। তিনি গ্রামের মানুষের জন্য লিখতেন পথনাটক, গান, এবং পরিবেশন করতেন জেলা-জেলায় ঘুরে।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,“ছোটবেলা থেকেই ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। ২৪ পরগনার কৃষক আন্দোলনে যুক্ত হই এবং তাদের জন্য গান লিখি। ১৯৪৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ মারা গেছে—যা আমি নিজের চোখে দেখেছি। সেই কারণেই আন্দোলন এবং আইপিটিএ’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। সে সময় দু’বছর সুন্দরবনে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকেছি, তবুও লেখালেখি ও সুর করা বন্ধ করিনি।”
চলচ্চিত্রে পথচলা
১৯৪৯ সালে বাংলা চলচ্চিত্র পরিবর্তন দিয়ে শুরু হয় তাঁর সিনেমার যাত্রা। খুব অল্প সময়েই পাশের বাড়ি (যার হিন্দি রিমেক পড়োশন) ও বারযাত্রী-এর মতো সাফল্যে তিনি শিল্পজগতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর প্রবেশও হয়েছিল একেবারে ঘটনাচক্রে। তিনি তখন কৃষকের জমি হারানোর গল্প নিয়ে একটি বাংলা ছবির চিত্রনাট্য লিখছিলেন। ঋষিকেশ মুখার্জী সেই গল্প পছন্দ করে জানান বিমল রায়কে। এরপরই তৈরি হয় ১৯৫৩ সালের ক্লাসিক ‘দো বিঘা জমিন’। যার সংগীতও পরিচালনা করেন সলিল চৌধুরী। এটি হিন্দিতে তাঁর ৭৫টি চলচ্চিত্র সংগীত পরিচালনার যাত্রার সূচনা।
তিনি ৪৫টি বাংলা, ২৬টি মালয়ালাম এবং আরও অন্তত ১০টি ভাষার ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেছেন, যা তাঁকে সত্যিকারের সর্বভারতীয় সুরকার হিসেবে পরিচিত করেছে।
সংগীত–নির্মাণে স্বাতন্ত্র্য
ভারতীয় চলচ্চিত্রে পূর্ব-পশ্চিম সংগীতের মেলবন্ধন ঘটানোর প্রথম পথিকৃৎদের একজন ছিলেন সলিল চৌধুরী। তিনি শুধু সুরে নয় বাদ্যযন্ত্রায়োজনে, ছন্দে, সুরমিশ্রণে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন।
মধুমতি (১৯৫৮)-র ‘দাইয়া রে চড় গইও’ হিন্দি গানে লোকসংগীত ঢুকিয়ে তিনি নতুন ধরনের স্বাদ দিলেন।
‘ইতনা না মুঝসে তু প্যার বাড়া’ মোজার্টের ৪০ নম্বর সিম্ফনির মূলে তৈরি তাঁর এক অনন্য সুর।
‘দিল তড়প তড়প কে’ শোনা যায়, একটি হাঙ্গেরিয়ান লোকসুর থেকে অনুপ্রাণিত।
‘ও সাজনা বরসা বহার আই’ লতা মঙ্গেশকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা গানের একটি।
কাবুলিওয়ালা–র ‘ঐ মেরে পিয়ারে ওয়তন’ আরবি-আফগান সুরের মিশ্রণে সৃষ্টি এক অমর আবেগ।
হাফ টিকিট–এর ‘আকে সিধি লাগি’ অদ্ভুত সৃষ্টিশীলতা; পুরুষ ও নারী—দুই কণ্ঠই গেয়েছেন কিশোর কুমার, ভিন্ন ভিন্ন স্বরে।
১৯৭০-এর দশকে তিনি আবারও উজ্জ্বল। আনন্দ, মেরে নিজের, রজনীগন্ধা, ছোট্টি সি বাত, এবং কালা পাথর- সব ছবির সংগীত আজও ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত।
অমর উত্তরাধিকার
সব ভাষার মানুষের হৃদয়ে তাঁর গান সমানভাবে বাসা বেঁধেছে ভালোলাগা, বেদনা, প্রেম, আশা ও আকুলতার সুরে। সময় পেরিয়ে গেলেও শ্রোতারা আজও সলিল চৌধুরীর মায়াময় সুর গেয়ে চলেছেন।
সলিল চৌধুরী শুধু বহু ভাষার সংগীত পরিচালকই নন-তিনি ছিলেন আন্দোলনের কণ্ঠ, সৃজনশীলতার আলোকবর্তিকা এবং শিল্পের সীমা ভেঙে দেওয়া এক অনন্য প্রতিভা। দ্য প্রিন্ট







