বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া। এটি এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। কারণ তালেবানের প্রথম শাসনামলে রাশিয়া ও তাদের সম্পর্ক ছিল চরম বৈরিতায় পূর্ণ। এখন আলোচনায় পরবর্তী কোন দেশগুলো এগিয়ে আসছে তালেবানের সমর্থনে।
শনিবার (৫ জুলাই) আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও তালেবানের মধ্যে নীরব যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান ২০২১ সালের আগস্টে কাবুল দখলের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক ঘনীভূত হলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। অনেক দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখলেও, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেউই তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।
রাশিয়ার অবস্থান
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ইসলামিক এমিরেট অফ আফগানিস্তান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনে সহায়ক হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি যে, ইসলামিক এমিরেট অফ আফগানিস্তান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান আমাদের দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি, পরিবহন, কৃষি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে গঠনমূলক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাশিয়া আফগানিস্তানে নিজের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করতে চায়, বিশেষ করে যখন পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রভাব সেখানে অনেকটা কমে এসেছে।
তালেবানের প্রতিক্রিয়া
রাশিয়ার এই ঘোষণা আফগানিস্তানে তালেবান নেতৃত্বে স্বস্তি এনেছে। আফগানিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্স (সাবেক টুইটার) এ প্রকাশিত এক পোস্টে জানায়, কাবুলে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি জিরনভ আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাশিয়ার স্বীকৃতির বার্তা প্রদান করেন।
তালেবান মুখপাত্ররা এটিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথে এক ‘গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং অন্যান্য দেশগুলোকেও একই পথে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যান্য দেশ কী করবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়ার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে চীন, ইরান, তুরস্ক এবং কিছু মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আরও আগ্রহী হতে পারে।
তবে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এখনো মানবাধিকার, নারী শিক্ষা ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলোকে সামনে রেখে তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধায় রয়েছে।
বিশ্ব মঞ্চে তালেবানের স্বীকৃতি পাওয়া তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হবে কি না- এখন সেটাই দেখার বিষয়। তবে রাশিয়ার এই পদক্ষেপ তালেবানকে কূটনৈতিকভাবে আরও অগ্রসর করেছে।
দেশগুলোর অবস্থান
চীন– ২০১৯ সালেই চীন তালেবানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। ২০২৩ সালে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সিএনপিসি তালেবান সরকারের সঙ্গে ২৫ বছরের তেল উত্তোলন চুক্তি করে। ২০২৪ সালে চীন তালেবান মুখপাত্র বিলাল কারিমকে দূত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে তারা এখনো তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেয়নি।
পাকিস্তান– একসময়ের প্রধান সমর্থক হলেও এখন প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে, তালেবান সরকার পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠী তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তান আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালায়, যাতে ৪৬ আফগান নাগরিক নিহত হয় বলে দাবি করে কাবুল।
ভারত– অতীতে তালেবানকে পাকিস্তানের হাতিয়ার মনে করলেও, এখন ভারত সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দুবাইয়ে তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর মে মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও মুত্তাকির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।
ইরান- ভারত-রাশিয়ার মতো ১৯৯০-এর দশক থেকে তালেবানদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক খারাপ ছিল। এরপর ১৯৯৮ সালে তালেবান কিছু ইরানি কূটনীতিককে হত্যা করায় সম্পর্ক চরমে পৌঁছায়। তখন থেকে ইরানও আইএস-খোরাসানকে বড় হুমকি মনে করে। তবে গত মে মাসের ১৭ তারিখ মুত্তাকি তেহরান ডায়ালগ ফোরামে অংশ নেন এবং ইরানের রাষ্ট্রপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে।
এরপর আর কোন দেশ তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়ার দিক থেকে মধ্য এশিয়ার কিছু দেশ এবং চীন হতে পারে পরবর্তী পদক্ষেপকারী। ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর কবীর তানেজা আল জাজিরাকে বলেন, ‘পার্শ্ববর্তী দেশগুলো কৌশলগত ও নিরাপত্তার স্বার্থে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এ স্বীকৃতি স্বেচ্ছায় নয়, বরং বাস্তবতার চাপ।’
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার স্বীকৃতি কাবুলে তাদের প্রভাব দৃঢ় করেছে। এটি তালেবানের জন্য আন্তর্জাতিক মর্যাদার দিক থেকেও বড় বিজয়।’








