কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশের জনগণ। এরপর দেশ বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, পরে হাসিনার ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী নেতৃত্বের অবসানের দাবিতে একটি বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়।
বুধবার (৭ আগস্ট) ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর, বিক্ষোব্ধ জনতা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হামলা চালায়। এছাড়াও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভবন এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাড়িতেও ভাঙচুর করে।
ভারতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমের মতে, এসময় দেশজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে। নাটোর, ঢাকা, পটুয়াখালী, যশোরসহ বেশ কয়েকটি শহরে হিন্দু মন্দিরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, বেশ কিছু ছাত্র এবং ধর্মগুরুরা মন্দিরের সামনে জড়ো হয়, সহিংসতা থেকে এগুলোকে রক্ষা করতে।
প্রতিবেশী ভারতের মতো বাংলাদেশেও হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় উত্তেজনার ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বাংলাদেশী হিন্দু সংখ্যালঘু, যা জনসংখ্যার ৮ শতাংশ, বিক্ষোব্ধ জনতা দ্বারা বেশ কয়েকবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। তবে এবারের বাংলাদেশী বিক্ষোভকারীদের দ্বারা হিন্দু মন্দির ও সম্প্রদায়ের উপর হামলা সম্পর্কে অনেক রিপোর্ট সত্য ছিল না।
ডয়চে ভেলে ফ্যাক্ট চেক কয়েকটি ভাইরাল ছবি এবং ভিডিও নিয়ে তদন্ত করেছে।
হিন্দু ক্রিকেটারের বাড়িতে আগুন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করা হয়, ‘বাংলাদেশি হিন্দু ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে’। এক্স একটি পোস্টে অভিযোগ করা হয়, একজন বিখ্যাত বাংলাদেশী হিন্দু ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে দুটি ছবির একটি কোলাজ শেয়ার করা হয়।
একটি ছবিতে একজন যুবককে একটি হিন্দু উপাসনালয়ের পাশে বসে থাকতে দেখা যায় এবং অন্য ছবিতে একটি জ্বলন্ত বাড়ি দেখা যায়। এক মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারী পোস্টটি দেখেছেন। কোলাজটি একই রকম দাবিসহ আরও অনেক অ্যাকাউন্ট দ্বারা প্রচার করা হয়েছিল।

ডয়চে ভেলের ফ্যাক্ট চেকে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
ছবির লোকটি প্রকৃতপক্ষে লিটন দাস, এবং একটি বিপরীত চিত্র অনুসন্ধান দেখায় যে ছবিটি তার অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে জ্বলন্ত বাড়িটি তার নয়। সেই চিত্রটির বিপরীত অনুসন্ধানের ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজার বাড়িতে বিক্ষোভকারীরা আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রকাশ পায়।
ডয়চে ভেলে বাড়িটির ভূ-নির্দেশনাও করেছে এবং নিশ্চিত করেছে এটি মাশরাফির-ই ছিল। মাশরাফি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং হাসিনার আওয়ামী লীগ দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোটের কারণে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এই ক্রীড়াবিদ সংসদ সদস্য ছিলেন, এই বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো একটি আসন জিতেছিলেন।
হিন্দু নারীদের ধর্ষণ, যৌন হয়রানির অভিযোগ
হিন্দু সংখ্যালঘু নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অনেক দাবি প্রচারিত হচ্ছে। দুইটি একাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে এবং হাজার হাজার বার দেখা হয়েছে। কিন্তু কিছু পুরানো এবং কিছু প্রেক্ষাপটের বাইরে প্রচারিত ঘটনাগুলো আগের ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়েছে।
ভিডিওগুলো একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, দেখা যাচ্ছে মুসলিম পুরুষরা একজন হিন্দু মহিলার অন্তর্বাস নেড়ে দিচ্ছে৷
এক্স-এর পোস্টে বলা হয়, এই বাংলাদেশি মুসলমানদের মনোযোগ সহকারে দেখুন, হিন্দু মেয়েদের ব্রা খুলে ফেলা হয়েছে এবং তারপর তাদের ধর্ষণ করা হয়েছে। এখন সে নির্লজ্জভাবে সেই ব্রা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তার পুরুষত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করছে।
ডয়চে ভেলের ফ্যাক্ট চেকে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
২৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে আক্রমণ করেছে। অনেক ছবি এবং ভিডিও অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, বিক্ষোব্ধরা হাসিনার জিনিসপত্র লুট করছে, তার জামাকাপড় এবং অন্তর্বাস এর মধ্যে ছিল। ভিডিওটির শেষ সেকেন্ডে লাল-বাদামী দেয়াল বিশিষ্ট একটি ভবন দৃশ্যমান, যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের মতো।
এজেন্সি ফুটেজ থেকে গণভবনের ভিডিও ও ছবিতে ভবনটির তুলনা করলে দেখা যায়, ভবনটি প্রকৃতপক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন।
চলমান সহিংসতা এবং আন্দোলনকে ঘিরে এমন আরও অনেকগুলো ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা মিথ্যা তথ্য এবং গুজব ছড়িয়েছে। আর এই ছবি এবং ভিডিওর মাধ্যমে মূলত জাতিগত উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।








