এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হলেও এ ধরনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
সোমবার (১০ আগস্ট) রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এনটিআরসিএর কার্যক্রম ও শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও কার্যকর করার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে অপতথ্য প্রচার না করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এর আগে মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট সচিবালয়ে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়। সভায় এনটিআরসিএকে মূল আইনি দায়িত্ব শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ অনুযায়ী এনটিআরসিএর মূল দায়িত্ব নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদান। ২০১৫ সালের পর থেকে সংস্থাটি নিবন্ধনধারীদের শূন্য পদের বিপরীতে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করে আসছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে নিবন্ধন সনদধারীদের মধ্য থেকে নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডি নির্ধারিত পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে।
২০১৫ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ
এনটিআরসিএ ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দিকে শুধু শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করত। ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে শূন্য পদের বিপরীতে নিবন্ধনধারীদের কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগের সুপারিশ শুরু হয়। গত এক দশকে এই ব্যবস্থায় এক লাখ ৭৭ হাজার ৫৭১ জন শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে এনটিআরসিএ। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয়ভাবে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ফলে স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক সুপারিশ ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ আগের তুলনায় কমেছে।
অন্যদিকে, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক শিক্ষক নিজ জেলা থেকে দূরের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ায় যোগদান, দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান এবং শূন্য পদ পূরণে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। স্থানীয়ভাবে নিয়োগের সুযোগ থাকলে এসব সমস্যা কমতে পারে বলে তাদের মত।
পুরোনো পদ্ধতি ফেরার আশঙ্কা
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা আবার ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে গেলে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, ২০১৫ সালের আগে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ছিল। তাই দীর্ঘদিনের সংস্কারের পর গড়ে ওঠা কেন্দ্রীয় ও তুলনামূলক মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবাদ
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশের পর বিভিন্ন ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন এর বিরোধিতা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)সহ কয়েকটি সংগঠন শিক্ষক নিয়োগে কেন্দ্রীয় ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া বজায় রাখার দাবি জানিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতারাও প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা গেলে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ বাড়তে পারে।
আইনি সংশোধনের প্রয়োজন
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনটিআরসিএর নিয়োগ-সংক্রান্ত ভূমিকা পরিবর্তন করতে হলে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০০৫’ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। আইনি ও প্রশাসনিক সব দিক পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে বর্তমানে এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা বাতিল বা ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।








