পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। কিন্তু এক শ্রেণির প্রতিবাদের মুখে ছবিটির প্রদর্শনী স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। আয়োজক কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা আপাতত প্রদর্শনী স্থগিত করেছে।
ঘটনাটি সারাদেশে শোরগোল তৈরি করে। বিশেষ করে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষেরা এই ঘটনায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
এ ঘটনায় প্রতিবাদে সোমবার (১ জুন) জাতীয় সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা মানববন্ধনের ডাক দেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুর ইউনিয়নে বিকেল ৪ টা ১৫ মিনিটে এই মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হওয়ার কথা জানান তিনি। এই ঘোষণাটা দিয়েছেন রুমিন ফারহানা নিজে।
তিনি ফেসবুক পোস্ট লিখেছেন, ‘উপস্থিত থাকবো আমি রুমিন ফারহানা।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০ সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিবৃতি
এদিকে, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০ সাংস্কৃতিক সংগঠন বিবৃতি দিয়েছেন। তারা বলছেন, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে গত ৩০মে অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে তানিম নূর পরিচালিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল।
কিন্তু একটি মহল ধর্মীয় আবেগের ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালায়। এর প্রেক্ষিতে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ পূর্বানুমতি প্রত্যাহার করায় প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়।
একই দিন কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামে স্থানীয় তরুণরা চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের উদ্যোগ নিলে স্থানীয় প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই দুটি ঘটনায় আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, আল মাহমুদসহ অসংখ্য গুণীজনের স্মৃতিধন্য পুণ্যভূমি। বছরের পর বছর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে সাংস্কৃতিক চর্চায় অনবদ্য অবদান রেখে আসছেন এ জেলার কৃতিসন্তানরা। সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিতের ঘটনা আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ ফিল্ম সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩ অনুযায়ী সরকার কর্তৃক প্রদর্শনের অনুমতিপ্রাপ্ত। ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশে এর প্রদর্শনী প্রশংসিত হয়েছে। এই চলচ্চিত্রের নির্মাতা তানিম নূরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতিসন্তান। নিজ জন্মভূমিতে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে না পারা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা চলচ্চিত্রকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করি, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আমরা সুস্থ, সুন্দর ও সৃজনশীল চলচ্চিত্রধারার পক্ষে। চলচ্চিত্র দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমস্যা, দেশপ্রেম, বাস্তবতা এবং মানবিক মূল্যবোধ জনগণের কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকারের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগের অনুমতি নিয়েই ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি জনসমক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তাঁর কন্যাসহ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে একটি চলচ্চিত্র উপভোগ করেছেন, যা চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের বহিঃপ্রকাশ। এমন বাস্তবতায় চলচ্চিত্রের প্রতি কারও বৈরি দৃষ্টিভঙ্গি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। আমরা সকলের মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তবে কোনো মহলবিশেষের অগণতান্ত্রিক আচরণ, অসহনশীলতা ও উগ্রতাকে আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
বিবৃতিদাতা: সাংবাদিক আবদুন নূর, আহ্বায়ক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র অ্যাড। নাসির মিয়া, সদস্যসচিব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নীহার রঞ্জন সরকার, সাধারণ সম্পাদক, খেলাঘর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, জহিরুল ইসলাম, সভাপতি, উদীচী জেলা সংসদ ফেরদৌস রহমান, সাধারণ সম্পাদক, উদীচী জেলা সংসদ, অধ্যাপক মানবর্দ্ধন পাল, সভাপতি, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটি অধ্যাপক মাসুদ-উর-রহমান, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটি, শোভা সেন, সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সাথী চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, হাবিবুর রহমান পারভেজ, জেলা পরিচালক, আবরণী শারমিন সুলতানা, সহকারী পরিচালক, আবরণী, হুমায়ুন কবির, সভাপতি, কবির কলম আব্দুল মতিন শিপন, সাধারণ সম্পাদক, কবির কলম, ডা. প্রেমানন্দ দাস, সংগঠক, চারণ, ফাহিম মুনতাসির, সভাপতি, সোনালি সকাল সানিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, সোনালি সকাল, মুস্তাফা জাফরি হামিম, জেলা সভাপতি, আজকের সংস্কৃতি সংগঠন সর্পা মিত্র ভৌমিক, সাধারণ সম্পাদক, আজকের সংস্কৃতি সংগঠন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ছবিটির প্রদর্শনী না করতে যে প্রচার চলছে, সেটা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূরও। তিনি বলেছিলেন, ‘তারা আমার ছবির পোস্টারে ক্রস চিহ্ন দিয়ে প্রচার করছে, উগ্রবাদী কথাবার্তা বলছে। এটা তো তারা করতে পারে না। ভয়ংকর ব্যাপার, এটা পুরোপুরি বেআইনি। কেউ যদি চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের সনদ পাওয়া কোনো ছবি নিষিদ্ধের কথা বলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিক্ষার্থীদের সামাজিক সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এই সংগঠনের সদস্য। এক বছর ধরে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছিলেন তারা।








