মহান আল্লাহ তা’আলা কোনো একটি বিষয় একবার ইরশাদ করলেই মানুষ তার গুরুত্ব উপলব্ধি করে তা পালন করে থাকে। যেমন, রোজা মাত্র একবার বলাতেই মানুষ দীর্ঘ এক মাস রোজা আদায় করে। কিন্তু যাকাতের কথা বিভিন্ন ভঙ্গিতে মোট ৮২ বার উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও যাকাত (৩০ বার), কোথাও সাদাকা (৯ বার) আবার কোথাও ইনফাক (৪৩ বার) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং যাকাত আদায় না করার পরিণতি হিসেবে জাহান্নামের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
এতে সহজেই আমরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি। তারপরও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাতের গুরুত্ব এবং দারিদ্র্য বিমোচনে এর ভূমিকা নিম্নে আলোচনা করা হলো।
যেসব খাতের সম্পদের উপর যাকাতের বিধান লাগু হয়, সেসব সম্পদের ক্ষেত্রে নেসাব পরিমাণ সম্পদ তথা সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত মজুদ থাকলেই যাকাত ফরয হয়। যাকাতের ফরয হলে সেসব সম্পদের আড়াই পার্সেন্ট হারে সেসব শ্রেণীকে যাকাত দিতে হয়, যাদের দেয়ার ব্যাপারে কুরআন মাজিদের নির্দেশনা রয়েছে। তবে যাকাতের হিসেব নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মুফতিগণের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
আমাদের দেশে যাকাত শব্দটি শুনতেই সর্বপ্রথম যে দৃশ্যপট মস্তিষ্কে ভেসে উঠে তা হলো- কোনো এক মহামান্য হর্তাকর্তার বাড়িজুড়ে খেটে-খাওয়া অসহায় মানুষের সমাবেশ। উপস্থিত সবার উদ্দেশ্য এক হলেও প্রত্যাশায় থাকে কিছুটা ভিন্নতা। শাড়ি, মশারি, লুঙ্গি কিংবা একখান গামছার জন্য ভীড় জমে সেখানে। তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে প্রয়োজনের তাগিদে এটুকু সংগ্রহ করতেই হুমড়ি খেয়ে পড়া দৃশ্য ফ্রেমবন্দী করে ক্যাপশনে আলহামদুলিল্লাহ লিখে সোস্যাল মিডিয়ায় পাবলিশ করাই যেন কারও কারও যাকাতের মূল উদ্দেশ্য!
যাকাত আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ হলো পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, বর্ধিত হওয়া, বৃদ্ধি করা, মার্জিত করা ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায়, নিজের ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ গরীব-মিসকিন ও অভাবী লোকদের মাঝে বণ্টন করাকে যাকাত বলা হয়। যাকাত কেবল ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভই নয়, যাকাত ইসলামী জীবন ব্যবস্থারই অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ। যাকাত ইসলামের অন্যতম প্রধান বাধ্যতামূলক ইবাদত। ঈমানের পর নামাজ আর নামাজের পরই যাকাতের স্থান।
যাকাত কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোধগম্য হয় এ আয়াত থেকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা বলেছেন: তারা যদি কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে খাঁটিভাবে ঈমান আনে এবং নামাজ কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাইয়ে পরিণত হবে।
সূরা তাওবার উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকাতের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেছেন, শুধু কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করা এবং ঈমান আনার কথা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, সে যে কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে ঈমান এনেছে; তার প্রমানের জন্য যথারীতি নামাজ আদায় করা ও যাকাত দেয়া অপরিহার্য। অতএব তারা যদি তাদের এরূপ বাস্তব কাজ দ্বারা এ কথার প্রমাণ পেশ করে, তাহলে নিশ্চয় তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই, অন্যথায় এমনটা নয়।
এছাড়াও যাকাত আদায় করা ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারের অপরিহার্য দায়িত্ব। এ সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনে বলেন: তারা হচ্ছে সেই সব লোক, যাদেরকে আমি রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত ব্যাবস্থা চালু করবে, মানুষকে সৎকাজের আদেশ করবে এবং অন্যায়-অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে।
সূরা হজ্জ এর ৪১ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আরও বলেন: হে নবী, তাদের সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করে তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করুন।
যাকাত বণ্টনের সুনির্দ্দিষ্ট খাতসমূহ উল্লেখের পর ফি সাবিলিল্লাহ খাত ব্যাপক অর্থপূর্ণ। কারণ বাকি ৭টি খাতে ব্যয়ও মূলত আল্লাহর পথেই। আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে যেকোন নেক কাজে ব্যয়ই আল্লাহর পথে। যুগের প্রয়োজনে সমসাময়িক ফকিহরা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে এ খাতে ব্যয় ঠিক করতে পারেন। একটা সুযোগ শরীয়ত প্রণেতা উন্মুক্ত রেখেছেন। ফি সাবিলিল্লাহ জিহাদ ফি সাবিল্লিাহ অবশ্যই। কিন্তু নির্দ্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। বর্তমান যুগে উম্মাহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নানামুখী তৎপরতা বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতা বেশি প্রয়োজন। জ্ঞানের দৈন্যতা উম্মাহর জন্য বড় সমস্যা। পত্র-পত্রিকা, বই-পুস্তক রচনা এবং দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে মুবাল্লিগ নিয়োগ কাজে এ খাত থেকে ব্যয় করা যেতে পারে।
শিক্ষকদেরকে সম্মানি দেয়া যাবে যদি তারা দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত থাকার কারণে আয় উপার্জনের আর কোনো সুযোগ না পান। আল্লাহর বাণী: এটা (যাকাত) প্রাপ্য সেসব অভাবগ্রস্ত লোকদের, যারা আল্লাহর কাজে নিয়োজিত থাকায় জীবিকার জন্য জমিনে পদচারণা করতে পারে না এবং (আত্মসম্ভ্রমের কারণে) কারও নিকট হাত পাতে না বলে অজ্ঞ লোকেরা তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদের (দারিদ্রের) লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের নিকট মিনতি করে যাচনা করে না। আর যে কল্যাণকর কিছু তোমরা ব্যয় করো, নিশ্চয় আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত। বাকারা ২৭৩।
যাকাত মূলত অর্থ সম্পদ পবিত্র করার একটি মাধ্যম। তাই যাদের কাছে প্রয়োজনের অধিক বা পর্যাপ্ত সম্পদ আছে তাদের সম্পদের সামান্য পরিমাণ গরিব-মিসকিনদের দেয়াটাই হলো যাকাত। বিত্তবানদের অবশ্যই বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে তাদের সম্ভাব্য সব উপায়ে সাহায্য করে সেবা করতে হবে। যাকাত একটি স্বেচ্ছামূলক দাতব্য নয়; বরং এটি বাধ্যবাধকতা। ফরয বিধান। এর মাধ্যমেই দারিদ্রতা বিমোচন করা সম্ভব।








