বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের পটভূমিতে নির্মিত পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র ‘রক্তবীজ ২’ মুক্তির পর থেকেই আলোচনায় রয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক গৌতম লাহিড়ীর বই ‘প্রণব মুখার্জী: রাজনীতি ও কূটনীতির ছায়া’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি বাস্তব ঘটনা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এক গভীর কাহিনি তুলে ধরেছে।
নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখার্জীর যৌথ পরিচালনায় তৈরি ‘রক্তবীজ ২’ মূলত এক রাজনৈতিক থ্রিলার, যেখানে সীমান্ত সন্ত্রাস, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা উঠে এসেছে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ছবির শুরুতেই দর্শককে টেনে নেয় ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্রের মধ্যে— নতুন খলনায়ক মুনির আলম নামের এক চরিত্র সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করে। সেই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে নামেন ভারতের এক উচ্চপদস্থ তদন্ত কর্মকর্তা পঙ্কজ সিংহ (আবির চট্টোপাধ্যায়) এবং তাঁর সহকর্মী এসপি সংযুক্তা (মিমি চক্রবর্তী)।
চলচ্চিত্রের গল্প যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয় এটি কেবল সন্ত্রাসবাদ বা তদন্তের গল্প নয়— টি দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার গল্পও বটে। চরিত্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সংঘাত ‘রক্তবীজ ২’-কে সাধারণ থ্রিলার থেকে আলাদা করেছে।
অভিনয়ের দিক থেকে ছবিটি বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। আবির চট্টোপাধ্যায় তাঁর চরিত্রে যেমন সংযম ও ভারসাম্য দেখিয়েছেন, তেমনি মিমি চক্রবর্তী পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকায় দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি রেখেছেন। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছেন অঙ্কুশ হাজরা, যিনি খলনায়ক মুনির আলম চরিত্রে গভীরতা ও তীক্ষ্ণতা এনেছেন। তাঁর চরিত্র শুধুই একটি নেতিবাচক রূপ নয়—বরং এক আহত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।
সহশিল্পীদের মধ্যে ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, কৌশানী মুখার্জী ও সীমা বিশ্বাস তাঁদের সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতিতে গল্পকে দৃঢ় করেছে।
চিত্রনাট্য লিখেছেন জিনিয়া সেন, যিনি রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি সুন্দরভাবে ধরে রেখেছেন। সীমান্ত, শহর ও আন্তর্জাতিক স্থানের চিত্রায়ণে সিনেমাটির দৃশ্যবিন্যাস হয়েছে অত্যন্ত পরিপাটি। অ্যাকশন ও থ্রিলার সিকোয়েন্সগুলোতে গতি ও উত্তেজনা বজায় রয়েছে, যদিও কিছু ক্লাইম্যাক্টিক দৃশ্য কিছুটা দীর্ঘ মনে হতে পারে। সঙ্গীত ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর গল্পের আবহে সামঞ্জস্য রাখলেও কিছু জায়গায় আরও গভীরতা যোগ করা যেত বলে মত দিয়েছেন সমালোচকেরা।
বি-বাংলায় প্রকাশিত মালিহা মমতাজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘রক্তবীজ ২’ কেবল একটি রাজনৈতিক থ্রিলার নয়— এটি রাষ্ট্র, সীমান্ত ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়ে তৈরি এক চিন্তাশীল চলচ্চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে নৈতিক প্রশ্ন, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা এবং মানবতার অনিবার্য টানাপোড়েন।
সমালোচকদের মতে, কিছু সংলাপে ক্লিশে ভাব থাকলেও এবং রোমান্টিক সাবপ্লট মাঝে মাঝে থ্রিলারের গতি কমিয়ে দিলেও, সামগ্রিকভাবে এটি একটি পরিণত ও শক্তিশালী সিনেমা। দর্শকদের জন্য এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের চিন্তার খোরাক।
‘রক্তবীজ ২’ প্রমাণ করেছে, বাংলা সিনেমা এখন আন্তর্জাতিক মানের রাজনৈতিক থ্রিলার নির্মাণেও সক্ষম। ছবিটি মনে করিয়ে দেয়—সীমান্ত শুধু ভূগোল নয়, এটি মানুষের মনেও আঁকা এক দাগ, আর সেই দাগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সত্যিকারের রক্তবীজ।







