উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তী সাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত হলো এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় বুধবার রাতে ঐতিহাসিক পুরান ঢাকার লালবাগ কেল্লা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় ধ্রুপদী সুর ও আলোকসজ্জার এক অনন্য মিলনমেলায়।
কেল্লার প্রবেশ ফটক থেকেই যেন ভেসে আসে মুগল আমলের আভিজাত্য—ঝলমলে আলো, সাজসজ্জা আর প্রাচীন স্থাপত্যের মায়াময় আবেশে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সন্ধ্যার পরিবেশ।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি ভিডিও বার্তায় বলেন, “বিশ্ব সংগীতের ভুবনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এক কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব, যিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লায় তাঁর জন্মবার্ষিকী উদযাপন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।”
উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ফারুকী বলেন, “ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শুধু এক সংগীতগুরু নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক দর্শন—যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।”
গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তাঁদের বক্তব্যে গাজার চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানান। এ সময় দর্শক সারিতে ওঠে স্লোগান—“ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন।”
প্রথমেই প্রদর্শিত হয় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জীবন ও কর্মভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র, যা দর্শকদের স্মৃতিপটে তুলে আনে এই মহাসাধকের দীর্ঘ সাধনাময় জীবন। এরপর পণ্ডিত অসিত দে পরিবেশন করেন রাগ ভীমপলশ্রীতে খেয়াল, যার সুরে অনুরণিত হয় গুরুস্মৃতির আবেশ।
রাত পৌনে ৯টায় শুরু হয় রাগ কিরওয়ানির পরিবেশনা। এতে অংশ নেন বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা—অভিজিৎ কুন্ডু (ধ্রুপদ কণ্ঠ), প্রশান্ত ভৌমিক ও ফাহমিদা নাজনীন (তবলা), শুক্লা হালদার (এস্রাজ), নিলয় হালদার (সারেঙ্গি), ইসরা ও ইলহাম ফুলঝুরি খান (সরোদ), সোহিনী মজুমদার ও মোহাম্মদ কাওছার (সেতার)। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন মৈত্রী সরকার।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে মঞ্চে আসেন অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ—ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রপৌত্র সিরাজ আলী খান। তিনি জানান, “আজ যে সরোদটি বাজাচ্ছি, এটি আমার বড় বাবার সরোদ—প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো।” তাঁর বাজনায় সহশিল্পী ছিলেন কল্লোল ঘোষ ও আর্চিক ব্যানার্জী (তবলা)। মঞ্চে এই সুরের ধারা যেন ফিরিয়ে আনে মাইহারের গুরুকুলের অনুরণন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ, জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাবসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কূটনীতিকসহ জাপান, ইতালি, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, বতসোয়ানা ও ইউনেস্কোর প্রতিনিধি দল।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কিংবদন্তী অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা আফজাল হোসেন ও মারিয়া ফারিহ্ উপমা।








