বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরে ব্যাংকিং খাত এমন এক কেন্দ্রবিন্দু, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে বিনিয়োগ, উৎপাদন, বাণিজ্য এবং আর্থিক প্রবাহের পুরো কাঠামো। এই খাতের স্থিতিশীলতা মানেই অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, আর এর দুর্বলতা মানেই সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা সংকট, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং আস্থাহীনতার কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত একটি চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদের বক্তব্য ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তবতা ও সম্ভাব্য উত্তরণের পথ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন এই সময়ের জনপ্রিয় টক শো ইউসিবি টু দ্য পয়েন্টে।
তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, এমন এক সময়ে যখন ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা ছিল নানা ধরনের চাপের মধ্যে। তার ভাষায়, তখনকার প্রধান সমস্যা ছিল তিনটি—তারল্য সংকট, উচ্চমাত্রার নন পারফর্মিং লোন এবং মূলধন ঘাটতি। এই তিনটি সমস্যা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই একটি সাধারণ বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “এই নন পারফর্মিং লোনের কারণে আমাদের ক্যাপিটাল সমস্যাটাও হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যেটা পুরো ইন্ডাস্ট্রির একটা সমস্যা এখন বলা চলে।”
এই পরিস্থিতিতে তিনি যে কৌশল গ্রহণ করেন, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল আস্থা পুনর্গঠন। তিনি মনে করেন, একটি ব্যাংকের অস্তিত্ব নির্ভর করে তিনটি পক্ষের ওপর—গ্রাহক, কর্মী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এই তিন পক্ষের আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো ব্যাংকের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই ইউসিবির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার শুরুতেই এই তিনটি স্তম্ভকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ইউসিবি একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকটি ঘোষণা করে যে কোনো পরিস্থিতিতেই গ্রাহকের আমানত উত্তোলনে বাধা দেওয়া হবে না। এটি ছিল একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ একই সময়ে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি খুব শক্তিশালী ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত নগদ সংরক্ষণ হার এবং অন্যান্য আর্থিক সূচক বজায় রাখার ক্ষেত্রে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদের মতে, এই ঝুঁকি নেওয়া জরুরি ছিল। তিনি বলেন, “আস্থার জায়গাটাতে যদি ফাটল ধরে তাহলে কিন্তু এই ঘুরে দাঁড়ানোটা সম্ভব হতো না।”
এই সিদ্ধান্তের ইতিবাচক ফলাফল দ্রুতই দৃশ্যমান হয়। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানত বৃদ্ধি পায় ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। মোট আমানত ৭০ হাজার কোটি টাকার মাইলফলক অতিক্রম করে। এই অর্জন প্রমাণ করে যে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে একটি ব্যাংক খুব দ্রুতই পুনরুদ্ধার করতে পারে।
সহকর্মীদের আস্থা অর্জনের বিষয়টিও তিনি সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। ব্যাংকের কর্মীরা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তবে তারা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন না। তাই তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন যে ব্যাংকটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে চাকরি হারানোর কোনো আশঙ্কা নেই। একই সঙ্গে তিনি বলেন, “ব্যাংকটার গ্রোথের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদের গ্রোথও হতে থাকবে।” এই বার্তা কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে এবং তারা নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন—সাফল্যের ধারাবাহিকতা। তার মতে, “সাকসেস ব্রিডস সাকসেস।” অর্থাৎ, একটি ছোট সাফল্য পরবর্তী সাফল্যের পথ তৈরি করে। ইউসিবির ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে। প্রতিটি মাসে যখন ইতিবাচক ফলাফল আসতে শুরু করে, তখন তা কর্মীদের আরও উৎসাহিত করে এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্স উন্নত হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, স্বচ্ছতা এবং সঠিক তথ্য প্রদান এই সম্পর্কের ভিত্তি। ইউসিবি নিয়মিতভাবে তাদের কার্যক্রম, অগ্রগতি এবং চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে শেয়ার করেছে। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও ব্যাংকটির প্রতি আস্থা রাখতে পেরেছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার মতে, খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশের বেশি, যা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, “মোর দেন ওয়ান থার্ড হচ্ছে নন পারফর্মিং লোন,” যা ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এর ফলে ব্যাংকের আয় কমে যায় এবং মূলধনের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
তারল্য সংকটের বিষয়টিও তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। ব্যাংকগুলো তাদের আমানতের বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণ করে, ফলে হঠাৎ করে যদি অনেক গ্রাহক একসঙ্গে টাকা তুলতে চান, তাহলে সংকট তৈরি হয়। তিনি বলেন, “কোন ব্যাংকেই কিন্তু পুরো ডিপোজিটটা তরল আকারে থাকে না।” এই বাস্তবতা তখনই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যখন আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়।
রাজনীতি ও ব্যাংকিং খাতের সম্পর্ক নিয়ে তিনি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার মতে, সরাসরি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অর্থনীতির মাধ্যমে একটি পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে এবং সেই প্রভাব ব্যাংকিং খাতেও পড়ে। তবে তিনি সতর্ক করেন যে অযাচিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে তিনি সুশাসনের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন—দুই ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হতে হবে। তিনি বলেন, “পলিসি ঠিক থাকলে যদি ইমপ্লিমেন্টেশন ঠিক না থাকে তাহলে আপনার সেখানে সুশাসনের অভাব ঘটে।”
সুদের হার এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তার বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সুদের হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি বিনিয়োগের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যদি সুদের হার বেশি হয়, তবে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগ বিমুখতা তৈরি হয়। আবার সুদের হার কম হলে বিনিয়োগের প্রবণতা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের বন্ড এবং বিলের সুদের হারও ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করে। যদি সরকার উচ্চ সুদে বন্ড ইস্যু করে, তবে ব্যাংকগুলোর জন্য কম সুদে আমানত সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই হার কিছুটা কমেছে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক।
সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য তার পরামর্শও স্পষ্ট। তিনি বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আমানত বৃদ্ধি করার ওপর জোর দিতে হবে।
তিনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কথাও উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ প্রবাহ এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তার মতে, নতুন প্রজন্ম ব্যাংকে গিয়ে কাজ করতে চায় না; তারা মোবাইলের মাধ্যমে সবকিছু করতে চায়। এই চাহিদা পূরণের জন্য ইউসিবি “ওয়ান অ্যাপ” চালু করেছে, যেখানে ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি দৈনন্দিন নানা সেবা পাওয়া যায়।
রেমিট্যান্স নিয়ে তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইউসিবি এই ক্ষেত্রে দ্রুত সেবা, প্রণোদনা এবং বিশেষ ঋণ সুবিধা প্রদান করছে।
মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, ব্যাংকিং খাতের সংকট যত জটিলই হোক না কেন, সঠিক নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং আস্থার ভিত্তিতে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তার অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যাংকের নয়, বরং পুরো খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি আশার বার্তা বহন করে।
এই প্রেক্ষাপটে তার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সংকটকে তিনি কখনোই শুধুমাত্র আর্থিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখেন না, বরং এটিকে একটি মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, যখন একটি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক খবর প্রকাশ পায়, তখন শুধু গ্রাহকরাই নয়, কর্মীরাও মানসিকভাবে চাপে পড়ে যান। এই চাপ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে দুর্বল করে এবং কার্যক্রমে ধীরগতি সৃষ্টি করে। ফলে একটি সংকট দ্রুতই বহুমাত্রিক রূপ নেয়। এই জায়গায় নেতৃত্বের ভূমিকা হয়ে ওঠে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নেতৃত্ব যদি স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে এবং একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে, তবে সেই মানসিক অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসে।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ব্যাংকিং খাতে আস্থা সংকট তৈরি হওয়ার পেছনে তথ্যের ঘাটতি এবং গুজবও বড় ভূমিকা রাখে। যখন গ্রাহকরা সঠিক তথ্য পান না, তখন তারা নিজেরাই বিভিন্ন অনুমান করে এবং সেই অনুমান অনেক সময় আতঙ্কে রূপ নেয়। এই আতঙ্কই একসময় ব্যাংক রানের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে গ্রাহকরা একযোগে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন। ইউসিবির ক্ষেত্রে তিনি এই পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তার ভাষায়, এমন দিনও গেছে যখন একদিনেই হাজার কোটি টাকার বেশি উত্তোলন হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে শুধু আর্থিক প্রস্তুতি নয়, বরং যোগাযোগ কৌশলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, নিয়মিতভাবে সঠিক তথ্য শেয়ার করা এবং গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখা আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদ ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার শুধু একটি আর্থিক সমস্যা নয়, বরং এটি সুশাসনের অভাবের প্রতিফলন। যখন ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ায় যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয় না বা রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাবের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন সেই ঋণ ফেরত আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এর ফলে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নতুন বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যায়। এই চক্রটি দীর্ঘমেয়াদে পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন যে, ব্যাংকিং খাতের উন্নতির জন্য শুধু ব্যাংকগুলোর নিজস্ব উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এখানে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক—এই তিন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, অথবা ব্যাংকগুলো যদি সেই নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে, তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। একইভাবে, সরকারের অর্থনৈতিক নীতিও ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করে। তাই এই তিনটি স্তরের মধ্যে একটি সুসমন্বিত সম্পর্ক থাকা জরুরি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন স্থিতিশীলতা—অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই। বিনিয়োগকারীরা সবসময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাই তারা এমন একটি পরিবেশ চান যেখানে অনিশ্চয়তা কম থাকবে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনেক সময় এই স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে তিনি ব্যাংকগুলোর জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের কথা বলেন। একদিকে তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, অন্যদিকে গ্রাহকদের জন্য সেবা সহজ ও আকর্ষণীয় করতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে পারলেই ব্যাংকগুলো টেকসইভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।
ডিজিটাল রূপান্তরের প্রসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে আশাবাদী। তার মতে, ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তিনির্ভর এবং গ্রাহককেন্দ্রিক। ইউসিবি “ওয়ান” অ্যাপ চালুর মাধ্যমে এই দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকরা শুধু ব্যাংকিং সেবা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সেবাও এক জায়গা থেকে পেতে পারবেন। তিনি মনে করেন, এই ধরনের উদ্যোগ গ্রাহকদের সময় ও শ্রম বাঁচাবে এবং ব্যাংকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।
রেমিট্যান্স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান শক্তি। প্রবাসীরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তা শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেও শক্তিশালী করে। তিনি জানান, ইউসিবি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করছে, যাতে তারা সহজে এবং দ্রুত অর্থ পাঠাতে পারেন। একই সঙ্গে যারা এই অর্থ গ্রহণ করেন, তাদের জন্যও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্সকে শুধু একটি আর্থিক প্রবাহ হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে একটি সম্ভাবনা হিসেবেও দেখতে হবে। যদি এই অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। এজন্য ব্যাংকগুলোর উচিত প্রবাসী আয়ের ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন আর্থিক পণ্য তৈরি করা।
তিনি একটি আশাবাদী বার্তা দেন। তার মতে, ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সংকট স্থায়ী নয়। সঠিক নীতি, সুশাসন এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে এই খাত আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি এখনও দৃঢ় এবং এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংকিং খাতও পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে।
তার এই বিশ্লেষণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—সংকট যত বড়ই হোক না কেন, যদি আস্থা ফিরিয়ে আনা যায়, তবে পুনরুদ্ধার সম্ভব। ইউসিবির অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ। এখন প্রয়োজন এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো ব্যাংকিং খাতকে একটি টেকসই ও স্বচ্ছ পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।







