নিজেকে বলেন ‘স্পেশাল ওয়ান’। কোন ছকে কার দম্ভ ভেঙে কোথায় ইতিহাস লিখবেন, সে মন্ত্র জানা মানুষটার নাম হোসে মরিনহো। ধারাবাহিক নন, ঠোঁটকাটা স্বভাবের কারণে অনেকের প্রিয় পাত্রও নন। বিতর্ক আর নানান দ্বন্দ্বে বারবার মলিন হয়েছে সমস্ত অর্জন। খেয়ালী মরিনহো ফের ইতিহাস লিখলেন আপন ভঙ্গিতে, আপন খেয়ালে, ইচ্ছে মাফিক।
৬৪ বছর পর ইউরোপের মঞ্চে দেখা দুই দলের। ঐতিহাসিক ম্যাচ তো বটেই! ইতিহাসের পাতা ওল্টালো ঠিকই, কিন্তু ছন্নছাড়া রিয়াল মাদ্রিদ দেখল পুনরাবৃত্তি। ১৯৬২ সালের ২মে আমস্টারডামে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে ৫-৩ গোলে হেরেছিল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। বুধবার রাতে লিসবনের এস্তাদিও দা লুজ-এর লজ্জা ভুলে থাকতে চাইবে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের ক্লাব। এই হারের লজ্জা স্কোরলাইনে নয়। এই হার শক্তিমত্তার বিচারে যোজন যোজন দূরে থাকা এক দলের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়ার গ্লানি।
চলতি মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টিকে থাকতে হলে এই ম্যাচে জয়ের বিকল্প ছিল না বেনফিকার সামনে। কাগজে-কলমে এক অসম লড়াই। তাতে কী? কিন্তু ডাগআউটের মানুষটা যখন মরিনহো, তখন ‘স্পেশাল’ কিছু না হলে কী জমে! নড়বড়ে মাদ্রিদে তারকার ছড়াছড়ি, কিন্তু ভারসাম্যের লেশমাত্র নেই। সাবেক কোচ ভালো করেই জানতেন সে কথা। আরও জানতেন রিয়াল কোচের দায়িত্বে থাকা তার সাবেক শিষ্য আলভারো আরবেলোয়ার দৌড় কতখানি। মরিনহোর দল ফুটবলটা যতখানি পায়ে খেলে তার চেয়ে বেশি খেলে মগজ দিয়ে। বড় ম্যাচে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেয়ার কৌশল তার থেকে ভালো জানে ক’জন?
ম্যাচের শুরু থেকেই কাগজে-কলমে বড় দল রিয়ালকে চাপে চিড়েচ্যাপ্টা করে দেয়ার ব্রত নিয়েই মাঠে নামে বেনফিকা। গোলবারের সামনে কোর্তোয়া নামের অতিমানব না থাকলে প্রথমার্ধেই কমপক্ষে চার গোল হজম করতে হতো রিয়ালকে। তাইতো লোকে বলে, ‘বেলজিয়ান জিরাফ’ আসলে গোল ঠেকান না, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের খামখেয়ালিপনায় ধুঁকতে থাকা রিয়ালের দুর্বলতা আড়াল করেন প্রতি ম্যাচে। গোলকিপারের গ্লাভস যতই বিশ্বস্ত হোক, রক্ষণভাগ দুর্বল হলে প্রতিপক্ষের শট জাল খুঁজে নেবেই। হয়েছেও তাই। মূর্হুমুর্হু আক্রমণে পর্যুদস্ত রিয়ালকে প্রথমার্ধেই দুই গোল দেয় বেনফিকা। মরিনহোর শিষ্যদের দুর্দমনীয় কাউন্টার অ্যাটাকের সামনে খাবি খেয়েছে সাদা জার্সির স্কোয়াড।
স্কোরলাইন সব কথা বলে না। রিয়াল মূলত বেনফিকার কাছে নাকানি-চুবানি খেয়েছে পুরো ম্যাচে। মরিনহোর কৌশলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় আরবেলোয়া হয়ত বারবার ঘড়ি দেখে ম্যাচ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন। তার অপরিপক্বতা, বড় মঞ্চে ডাগআউট সামলানোয় যোগ্যতার ঘাটতি আর স্কোয়াডে নিয়ন্ত্রণের অভাব- চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সাবেক গুরু। আধুনিক ফুটবলে রক্ষণ, মাঝমাঠ আর আক্রমণ সব জায়গার ব্যালান্স গুরুত্বপূর্ণ। কোচের ট্যাকটিক্স অপরিহার্য। অথচ মাদ্রিদে মাঝ মাঠে কোন ছন্দ নেই, রক্ষণের খেলোয়াড়রা আনকোরা। আক্রমণে এক কাইলিয়ান এমবাপ্পে ছাড়া আর কারও খেলার ধার নেই।

মাদ্রিদের মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল না, ছিল না কোন সাজানো আক্রমণ। বেনফিকার প্রেসের সামনে বারবার খেইহারা নাবিকের মতো হাবুডুবু খেয়েছেন বেলিংহাম, শুয়ামেনি আর হাউসেনরা। আক্রমণে তটস্থ হয়ে পেনাল্টি হজম, দুজন খেলোয়াড়ের লাল কার্ড দেখা- আত্মগরিমায় ভোগা ‘গ্যালাক্টিকোস’ শিশুদের কাছ থেকে কীভাবে এসব আদায় করে নিতে হয় সে কৌশল মরিনহো জানেন। পুরো ম্যাচে বুড়ো ওটামেন্ডির দায়িত্ব ছিল রক্ষণ সামলে পেরেজের বখে যাওয়া ছেলেদের মাথা খাওয়া। স্পেশাল ওয়ানের বাকি শিষ্যরাও ঠাণ্ডা মাথায় খেলে করে গেছেন যে যার কাজ।
খেলায় ছন্দপতন ফলাফলে স্পষ্ট। এদিকে, প্রতি ম্যাচেই কোন না কোনভাবে সামনে আসে মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমের বিশৃঙ্খলা। কাল ভিনিসিয়াসের কোচের সাথে তর্ক, তো আজ বদলি হওয়ার পর মাঠ ছাড়ার সময় আর্দা গুলেরের গ্লাভস ছুঁড়ে মারা! মরিনহোর দলে এসব শিশুসুলভ জেদের সুযোগ নেই। বহু বড় খেলোয়াড়কে তিনি বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছেন কেবল শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে। আর তাই তার স্কোয়াডে থাকে অদম্য এক লড়াকু শক্তি। সুসজ্জিত সৈনিকদের মতো তার খেলোয়াড়রা খেলে যায় কোচের কৌশলে। রিয়ালের খেলোয়াড়রা যখন আত্মগরিমায় অন্ধ, ঠিক তখনই ৯৮ মিনিটে মরিনহোর ‘জাস্ট গো’ শুনে দৌড়ে প্রতিপক্ষের জালের সামনে চলে এলেন বেনফিকা কিপার আনাতোলি ট্রুবিন। মরিনহোকে বহুদিন ধরে চেনেন রিয়াল সমর্থকরা। তাই টিভিতে সাবেক কোচকে ‘জাস্ট গো’ বলতে দেখে নিশ্চিত প্রমাদ গুনেছেন অনেকেই! আর তাদের আশঙ্কা সত্যি করে দিয়ে আরও একবার ‘স্পেশাল ওয়ান’র লেখা আরও একটি বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হল ফুটবল বিশ্ব।

এদিকে, উপযুক্ত খেলোয়াড় ছাড়া বড় নাম দিয়েই কেবল ট্রফি জেতা যায় না, দম্ভে ভরা পেরেজ বোর্ডের মাথায় সে কথা হয়ত ঢুকেছে। আর বলিরপাঠা হতে আসা অপরিপক্ব আরবেলোয়ারা বুঝেছেন, ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে।’ আর ‘পেস্ট্রি খেতে খেতে’ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে বখে যাওয়া একদল তরুণ হয়ত এমন নাস্তানাবুদ হয়েও বোঝেননি, ফুটবল পুরোপুরি শৃঙ্খলার খেলা।
এই অপরিহার্য জয়ের ফলে বেনফিকা টিকে রইল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। নকআউটে ওঠার জন্য প্লে-অফের লড়াইয়ে টিকে রইল তারা। একইভাবে রিয়ালকেও খেলতে হবে প্লে-অফ। শত গৌরবে মহিমান্বিত ক্লাবটির এবার সরাসরি নকআউট খেলা হচ্ছে না। নিন্দুকরা অবশ্য টেনে আনতে চাইছেন ট্রোজান হর্সদের ইতিহাস। তাদের মতে, পতনের আগে সাম্রাজ্যে এমন বহু ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটে। প্রশ্ন হল, মরিনহোর হাতে নাস্তানাবুদ হয়েও কি পেরেজ বোর্ডের কানে পানি যাবে?
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







