এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
পাকিস্তানের নিষিদ্ধ উগ্রপন্থি সংগঠন তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সঙ্গে বাংলাদেশিদের যোগাযোগের একটি সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো নরসিংদীর শেখ আজিজুল হাক্কানিকে জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তরুণদের নিয়ে যাওয়ার পেছনে কারা কাজ করছে এবং দেশে তাদের সহযোগী নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত।
করাচি বিমানবন্দরে নামার পরপরই ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার হন আজিজুল হাক্কানি। টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ২০ মাস পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ২ আগস্ট তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থানায় নেওয়া হলেও পরে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ও টাস্ক ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলের সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তিন দিনের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৬ আগস্ট আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
অনলাইন থেকে মাঠের নেটওয়ার্ক
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশে থাকতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থি প্রচারণার কনটেন্টে আগ্রহী হয়ে ওঠেন হাক্কানি। ২০২০ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে যাওয়ার পর টিটিপির অনলাইন নেটওয়ার্কে তার সম্পৃক্ততা বাড়ে। ‘নাসের’ নামে এক আফগান নাগরিক এবং টিটিপির বাংলাদেশি সংগঠক হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে থাকা আল ইমরান ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দারের মাধ্যমে তার উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালে দেশে ফেরার পরও অনলাইনে যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন হাক্কানি। তদন্তকারীদের দাবি, বাংলাদেশে নাসেরের অনুসারী তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রাখেন। পরে ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
গন্তব্য ছিল পেশাওয়ার
তদন্তকারীদের ভাষ্য, হাক্কানির লক্ষ্য ছিল খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের পেশাওয়ার। সেখানে একটি মাদ্রাসায় তালেবান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। উদ্দেশ্য ছিল টিটিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংঘাতে অংশ নেওয়া। তবে করাচি বিমানবন্দরে গ্রেপ্তারের কারণে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পাকিস্তানি তদন্তকারীরা তার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফরেনসিক পরীক্ষায় টিটিপি-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলেও বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দুবাইয়ের কথা, শেষ ঠিকানা পাকিস্তান
হাক্কানির ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয় বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা বলছেন মাদারীপুরের ফয়সাল হোসেন ও গোপালগঞ্জের রতন ঢালী পরিবারকে দুবাই যাওয়ার কথা বলে দেশ ছাড়েন। তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালের মার্চে তারা অবৈধভাবে ভারত হয়ে আফগানিস্তানে যান। পরে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক এলাকায় পৌঁছান। ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে ফয়সাল ও রতনসহ ১৭ জন টিটিপি সদস্য নিহত হন বলে জানানো হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, দেশে থাকতেই তাদের টিটিপির সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল।

নিহত যুবরাজও একই বলয়ে?
সাভারের ২৩ বছর বয়সী আহমেদ জোবায়ের যুবরাজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের যাত্রাপথের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সৌদি আরব হয়ে পাকিস্তানে গিয়ে তিনি আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। পরে আবার পাকিস্তানে ফিরে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করেন। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানে টিটিপির ৫৪ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় যুবরাজও নিহত হন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। তার পরিবারকে অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে ফোন করে মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছিল।
এক মামলায় একাধিক নাম
টিটিপি নেটওয়ার্কের তদন্তে মো. ফয়সাল নামে আরও এক ব্যক্তির নাম আসে। ২০২৫ সালের ২ জুলাই সাভার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি যুবরাজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং যুবরাজের বিদেশযাত্রা সম্পর্কে জানতেন। ওই মামলায় আল ইমরান ওরফে ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দারসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পরবর্তী তদন্তে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার শামিন মাহফুজের নামও সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, পুরনো বিভিন্ন জঙ্গি মামলায় অভিযুক্ত শামিনের টিটিপির সঙ্গেও যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন এখন নেটওয়ার্কের গভীরতা নিয়ে
আজিজুল হাক্কানি, ফয়সাল, রতন, যুবরাজ, শামিন মাহফুজ ও ইমরান হায়দার ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পথে উগ্রপন্থার সঙ্গে জড়ালেও তাদের ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটিই এখন তদন্তের বড় প্রশ্ন। তদন্তকারীরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন অনলাইন যোগাযোগ, বিদেশে অবস্থানরত মধ্যস্থতাকারী এবং বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান-আফগানিস্তানে যাওয়ার পথকে। তাদের ধারণা, শুধু ব্যক্তিগত উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়া নয় এর পেছনে সংগঠিত যোগাযোগব্যবস্থা থাকলে তার শিকড় বাংলাদেশেও থাকতে পারে। আজিজুল হাক্কানির জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য, নিহত বাংলাদেশিদের যোগাযোগের রেকর্ড এবং বিভিন্ন মামলার নথি মিলিয়ে সেই সম্ভাব্য নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।








