এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মাশরুর শাকিলের লেখা ‘রবীন্দ্র চিন্তায় গণমাধ্যম’ গবেষণাধর্মী বইটি আমার প্রথমত ভালো লেগেছে ইতিহাস এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্যের ধারাবাহিক উপস্থাপনা। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও প্রয়াণের মধ্যবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের বিকাশ, প্রসার এবং তাতে রবীন্দ্রনাথের সম্পৃক্ততা বইটিতে ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজে পারিবারিকভাবে সাধনা, ভারতী এসব পত্রিকা প্রকাশের সাথে যুক্ত ছিলেন।
বইটি পড়তে গিয়ে আমি জেনেছি, ব্রিটিশ শাসনামলে গুপ্ত সংগঠনগুলো নিয়ে সাময়িক পত্রে লেখা হতো। সংবাদপত্রে স্বাধীন লেখালেখি কে ভয় দেখাতে সিডিশন বিলসহ নানা ধরনের আইনি কাঠামো তৈরি করে উপনিবেশিক শাসকরা। তাই তথ্য অধিকার আইন দিয়ে সাংবাদিকতার কন্ঠরোধ সেই পুরনো ঘটনারই একটি সংস্কার বলে মনে হয়েছে। অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী ‘জগৎ কুটির’ পড়তে গিয়েও পেয়েছি কিভাবে সংবাদপত্রে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত ছিল।
রবীন্দ্র চিন্তায় গণমাধ্যম বইটিতে আরো জেনেছি, রবীন্দ্রনাথ ‘সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ’ শিরোনাম প্রবন্ধে যে বর্ণনা দেন তাতে স্বাধীন গণমাধ্যমের প্রতি তার তীব্র এবং জোরালো মতামত স্পষ্ট হয়। তিনি আরো মত দেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মূলত শাসন ক্ষমতা কে সুসংহত করতে পারে। সংবাদপত্র রাজা ও প্রজার মধ্যে আত্মীয় সম্বন্ধ হতে পারে বলে মন্তব্য। শাসকরা যদি সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে চায়, তবে তা বিশাল জাহাজে ফটো দেখা দেওয়ার মতো বিষয় বলে মন্তব্য তার। একটি কথা আরো ভালো লেগেছে, সংবাদপত্র ঠিকমতো কাজ না করলে গুজব রহস্য দানা বাঁধে, অজানা আশঙ্কা চেপে বসে শাসকদের মনে। গুরুত্বপূর্ণ একটি লাইন, অন্তরদাহ বাক্যে প্রকাশ না হইলে অন্তরের সঞ্চিত হইতে থাকে।
রবীন্দ্রনাথের চৈতালি কাব্যগ্রন্থে নওগাঁর পতিসরের বর্ণনা আছে। যেখানে বলা হয়েছে ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখলে মনে হবে ঘোড়া মনে হয় সব সময় পা দুটো উপরেই করে রাখে। এখানে ক্যামেরার চোখ এবং মানুষের চোখের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রেস অ্যাক্টের বিরুদ্ধে বক্তব্য শোনেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সাংবাদিক গ্যালারি আছে সেই বর্ণনা দেওয়া হয়।
কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বলা হয়, শাসিতের বক্তব্য শাসকের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যই সংবাদপত্র ও কংগ্রেসের যাত্রা।
বইটিতে ব্রিটিশ শাসন এবং বহু রাজকতা সম্বন্ধে বলা হয়েছে- একটা দেশ যতই রসালো হোক না কেন, একজন রাজাকে পালতে পারে, দেশশুদ্ধ রাজাকে পারে না।
শেষের কবিতায় অমিতের বক্তব্য রিপোর্টার ঠিকমতো লিখতে পারে নাই বলে তা নিয়ে সমালোচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ সমসাময়িক সকল লেখকের বইয়ের রিভিউ দিতেন। সংবাদপত্রে অহেতুক নিন্দাবাদ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি, গুপ্ত সংগঠন গুলোর সংবাদ প্রচার করে পত্রিকার কাটতি বাড়ানো নিয়ে বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের লন্ডন ভ্রমণ নিয়ে বলা হয়েছে, সে সময় সমুদ্র যাত্রা বা কালাপানি পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাওয়া ছিল শাস্ত্র বিরুদ্ধ।
অনুবাদ চর্চা নিয়ে রেফারেন্স রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের লেখক অমিতাভ চৌধুরীর। এছাড়া বাংলাদেশের খ্যাতিমান শিশু সাহিত্যিক আমিরুল ইসলামের লেখা ও সংযুক্ত করা হয়েছে বইটিতে যেখানে বলা হয়, টেলিভিশন কখনো গভীর জ্ঞান বিতরণের বাহন হয়নি, সংবাদপত্র হয়েছে। যার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথের বিদেশ ভ্রমণের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা লেখা আছে এখানে। কোনটি মজার আবার কোনটির সাথে রিপোর্টারদের বিরম্বনা কথাও আছে বইটিতে। সিঙ্গাপুরে জাপানি নারীর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ (মজার অভিজ্ঞতা), জাপান যাবার পথে।
সুন্দর সুন্দর কিছু কথা আছে। যেমন: ভুলে যাওয়ার অধিকারে সংবাদপত্রের বাধা। তাই এখন আমরা প্রতিদিনের মানুষকে পাই, চিরদিনের মানুষকে সহজে পাই না।
রাশিয়ার সমাজতন্ত্র নিয়ে বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে তারা ব্যক্তিকে উপেক্ষা করেছে।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, খবরের কাগজে ইংরেজদের সঠিক খবর আসতো না, আসতো শুধু পক্ষপাতমূলক খবর। এখানে বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন: চট্টগ্রামে কারারক্ষীরা দুইজন রাজবন্দীকে খুন করে। ইংরেজ সংবাদপত্র কারারক্ষীদেরই পক্ষ নেয়, যার সমালোচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। সুইডিশ ব্যক্তির দাহ নিয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতে সমালোচনা করা হয়।
রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য বইয়ের রেফারেন্স আছে রবীন্দ্র চিন্তায় গণমাধ্যমে। যা পাঠককে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখা পড়তে তৎক্ষণাৎ আগ্রহী করে তুলবে। এই বিষয়টিই সর্বোপরি দারুন লেগেছে।








