বৃহস্পতিবার, পঁচিশে বৈশাখ (৮ মে)। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৪তম জন্মবার্ষিকী। গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ অমর সব সৃষ্টি দিয়ে বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গণে বাংলাকে অধিষ্ঠিত করে বাঙালি জাতিকে গর্বিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সব মিলিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় রবীন্দ্রনাথের অবদান অনন্য। কিন্তু শুধু পঠিত বা পাঠ্য হিসেবে নয়, রূপালি পর্দায়ও তার সাহিত্যকর্ম পেয়েছে এক নতুন জীবন।
তার লেখনিকে উপজীব্য করে নির্মিত বহু সিনেমাকে বলা হচ্ছে কালজয়ী। তার বহু গল্প ও উপন্যাসকে অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র, যা শুধুই সাহিত্যিক রস নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকেও তুলে ধরেছে গভীরভাবে।
অনেক নির্মাতাই মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য যেন এক জীবন্ত চিত্রনাট্য! তার রচনার ভেতরে যে জীবন, প্রেম, দ্বন্দ্ব, প্রতিবাদ, আত্মচেতনা ও আত্মত্যাগের ছাপ—তা যুগে যুগে অনুপ্রাণিত করেছে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। সাহিত্য যখন সিনেমার ভাষায় রূপ নেয়, তখন রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন আরও জীবন্ত, আরও সমকালীন।
জন্মদিনে এক ঝলকে জেনে নেয়া যাক রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে কালজয়ী কিছু সিনেমার কথা-
নষ্টনীড় → চারুলতা (১৯৬৪):
রবীন্দ্রনাথের গল্প নষ্টনীড়-এর উপর ভিত্তি করে পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের অনবদ্য নির্মাণ ‘চারুলতা’। মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য অভিনয় এবং সূক্ষ্ম নারীবাদের ছাপ এই ছবিকে করেছে কালজয়ী।
ঘরে বাইরে (১৯৮৪):
জাতীয়তাবাদ, নারী স্বাধীনতা ও সম্পর্কের দ্বন্দ্ব—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। সত্যজিৎ রায়ের অনন্য চিত্রনাট্য ও নির্দেশনায় এটি হয়ে উঠেছে এক অমূল্য চিত্রনাট্য সম্পদ।
চোখের বালি (২০০৩):
ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় ঐশ্বর্য রাইয়ের দুর্দান্ত অভিনয়ে ‘চোখের বালি’ হয়ে উঠে নতুন প্রজন্মের জন্য রবীন্দ্রনাথকে চেনার মাধ্যম। কেননা ঐশ্বরিয়াকে দিয়ে সেই সময়ে এমন সিনেমাতে কাজ করান ঋতুপর্ণ, যখন গোটা ভারতীয় সিনেমায় তার স্টারডম তুঙ্গে।
তিন কন্যা (১৯৬১)
রবীন্দ্রনাথের তিনটি গল্প—পোস্টমাস্টার, মনিহার, ও সমাপ্তি—নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের অ্যান্থোলজি ফিল্ম ‘তিন কন্যা’। বাংলা সাহিত্যের চিত্ররূপায়ণে এক অনন্য উদাহরণ মনে করা হয় সিনেমাটিকে।
নৌকাডুবি (২০১১)
ঋতুপর্ণ ঘোষের আরেকটি চিত্রনাট্যকেন্দ্রিক নির্মাণ যেখানে জটিল সম্পর্কের গাঁথুনি আর পরিচয়ের ভুল বিনিময়ে গড়ে ওঠা নাটকীয়তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
শেষের কবিতা (২০১২):
আধুনিক প্রেমের দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের ক্লাসিক ‘শেষের কবিতা’–কে নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন সুমন মুখোপাধ্যায়।
তবে সার্বিক বিবেচনায় ভারতীয় সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে, সে তুলনায় হাতে গোনা কাজ হয়েছে ঢাকাই সিনেমায়। যার প্রায় সবগুলো দর্শক নন্দিত সিনেমার সাথেই জড়িয়ে আছে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের নাম।
বাংলাদেশে রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে কাজ করতে এগিয়ে আসেন চিত্রনির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। রবীন্দ্রনাথের ‘শাস্তি’ গল্প অবলম্বনে ‘কাঠগড়া’ নামের একটি ছবির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। নানা জটিলতায় কাজটি শেষ হয়নি। পরে একই গল্পে ২০০৪ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম নির্মাণ করে ‘শাস্তি’ ছবিটি। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম রবীন্দ্র সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রধান চার চরিত্রে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন, চম্পা, রিয়াজ ও পূর্ণিমা।
তবে রবীন্দ্র সাহিত্যনির্ভর ছবির মধ্যে সবচেয়ে দর্শকপ্রিয় কাজ চাষী নজরুল ইসলামের ‘সুভা’ চলচ্চিত্রটি। এটির প্রযোজকও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। ছোটগল্প ‘সুভাষিণী’ অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে অভিনয় করেন শাকিব খান ও পূর্ণিমা। ‘সুভা’ চরিত্রে বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ের ভূমিকায় পূর্ণিমার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল সর্বমহলে। শাকিব খানের অভিনয়ও নজর কেড়েছিল সমালোচকদের।
বর্ষীয়ান নির্মাতা কাজী হায়াতও রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে সিনেমা করেছেন। তার পরিচালিত সিনেমার নাম ‘কাবুলিওয়ালা’, আর এটির প্রযোজকও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। এতে প্রধান অভিনয় করে নজর কাড়েন তৎকালীন সময়ের ঢাকাই সিনেমার শীর্ষ তারকা মান্না। মিনি চরিত্রে শিশুশিল্পী দীঘির অভিনয়ও প্রশংসিত হয়। এ ছবির জন্য সেরা শিশুশিল্পী চরিত্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় দীঘি।
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর প্রযোজনায় রবীন্দ্রনাথের গল্পে ‘চারুলতা’ নির্মাণ করেছিলেন সাইফুল ইসলাম মান্নু। ছবিতে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন, কুমকুম হাসান, সজল নূর। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ‘সমাপ্তি’ অবলম্বনে নির্মিত নির্মাতা নারগিস আখতার নির্মাণ করেন ‘অবুঝ বউ’। এ ছবিতে অভিনয় করেন ববিতা, ফেরদৌস, শাকিল খান ও নিপুণ। এ ছবির জন্য সেরা পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান নারগিস আখতার। আর এই ছবিটিও প্রযোজনা করে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম।
এছাড়াও প্রায় প্রতি বছরেই রবীন্দ্র সাহিত্য নির্ভর টিভি ফিকশন নির্মাণ করছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই। রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে নির্মাণের যে ধারা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম শুরু করেছিলো, তাদের দেখানো পথে এই সময়ে এসে তরুণ নির্মাতারাও রবীন্দ্র সাহিত্য থেকে নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছেন।








