টানা বৃষ্টিতে রাজধানীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, খাল-ড্রেনের দখল ও ভরাট এবং নাগরিকদের অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে অভিযান চালিয়ে নিউ মার্কেট এলাকার ড্রেন থেকে লেপ, তোশক, কাঁথা, বালিশ, বড় বড় বোল্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে।
ডিএসসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় বিপরীতমুখী পানিপ্রবাহ সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবে ড্রেনের পানি নদীতে নামতে না পেরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল, ভরাট এবং ড্রেন-নালায় জমে থাকা বালু ও আবর্জনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মঙ্গলবার দুপুরে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় নিউ মার্কেট এলাকার ড্রেন পরিষ্কার করতে গিয়ে লেপ, তোশক, কাঁথা, বালিশ এবং বোল্ডার (নির্মাণ বর্জ্য, ইট, কংক্রিটের ভারী টুকরো) উদ্ধার করা হয়েছে। এসব কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।
দক্ষিণ সিটির এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের একক প্রচেষ্টায় একটি পরিচ্ছন্ন ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগর গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে এবং ড্রেন বা খালে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মানুষ নিজের বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলেও বাইরে বেরিয়ে অনেক সময় রাস্তাঘাটে অবাধে ময়লা ফেলে। এই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। শহরকে নিজের বাড়ির মতো যত্নে রাখলে জলাবদ্ধতাসহ নানা নাগরিক সমস্যার সমাধান অনেকটাই সম্ভব হবে।
এদিকে নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে মতিঝিলের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ছয় মাসের পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে ডিএসসিসি। প্রকল্পের আওতায় পুরো ওয়ার্ডকে ২০টি সেক্টরে ভাগ করে ২০ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, সুপারভাইজাররা প্রতিটি সেক্টরের বাড়িঘর পরিদর্শন করে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করবেন এবং বাড়ির মালিকদের তা সমাধানের জন্য অবহিত করবেন। ছয় মাসের মধ্যে তিন দফায় তাদের সতর্ক ও পরামর্শ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা সমস্যার সমাধান করবেন, তাদের বাড়িকে ‘গুড সিটিজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। আর যারা নির্দেশনা অনুসরণ করবেন না, তাদের ‘ব্যাড সিটিজেন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়িতে বিশেষ মার্কিং দেওয়া হবে।
ঢাকা শহরে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির পর সৃষ্ট পরিস্থিতিকে বন্যা নয়, জলাবদ্ধতা হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতাই মানুষের জন্য মারাত্মক সংকট তৈরি করে। অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের খুব সামান্য অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় দীর্ঘদিনেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
মঙ্গলবার তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে জলাবদ্ধতা নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার মাত্র দায়িত্ব নিয়েছে। তবে অতীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি।”
তিনি বলেন, “আমাদের তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়েছে। আবার যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করা হয়েছে, তার খুব ছোট একটি অংশ কার্যকর হয়েছে। এসব সংকট সরকার পর্যালোচনা করবে।”
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হয়েছে আরও ৮২ মিলিমিটার। অর্থাৎ ১২ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১৫৮ মিলিমিটার।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ ঘণ্টায় ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টির পর রাজধানীর কিছু সড়ক থেকে ১৫ ঘণ্টায়ও পানি নামেনি। এর আগের বছর এক দিনে ঢাকায় ২৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিও হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ৩ ঘণ্টায় ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকা ডুবে যায়। মতিঝিল, কমলাপুর, গ্রিন রোড ও ঢাকা কলেজ এলাকার পানি ১২ ঘণ্টায়ও সরেনি।







