রাজধানীর মোহাম্মদপুরে লায়লা আফরোজ (৪৮) ও মেয়ে নাফিসা নওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) হত্যার ঘটনায় গৃহকর্মী আয়েশার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আসামির ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ বা কোনো ধরনের প্রযুক্তিগত পরিচয় পুলিশের কাছে না থাকায় তদন্ত এখন ‘ব্লাইন্ড স্পট’-এ। তবে হাল না ছেড়ে মাঠ পর্যায়ে তদন্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সোমবার দিবাগত রাতে নিহত লায়লা ফিরোজের স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। তবে এ ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডে পুলিশ কি ব্লাইন্ড স্পটে?
গতকাল সোমবার দুপুরের দিকে মোহাম্মদপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে মা-মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নাফিসা মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল আর মা লায়লা ছিলেন গৃহিনী। নাফিসার বাবা এ জেড আজিজুল ইসলাম রাজধানীর উত্তরার সানবিমস স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
মঙ্গলবার বিকেলে তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযুক্তের আসল নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার সময় তার সঙ্গে কোনো মোবাইল ফোনও ছিল না। ফলে প্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না।
মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ঘটনার সময় অভিযুক্তের কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। এ ছাড়া আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো অচল থাকায় তিনি কোন দিকে পালিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও জানান, গৃহকর্মীদের জড়িত থাকার পুরোনো ঘটনাগুলোর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। এসি মামুন বলেন, ‘আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আশা করি দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।’
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন বলেন, হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ আসামিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
একাধিক মোটিভ নিয়ে তদন্তে পুলিশ
হত্যাকাণ্ডের সম্ভব কয়েকটি মোটিভ নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। চলছে সিসিটিভি ও আশপাশের ফুটেজ বিশ্লেষণ। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘‘হত্যাকাণ্ডটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা হঠাৎ উত্তেজনা থেকে কিংবা ডাকাতির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হত্যা হতে পারে। কিংবা গৃহকর্মীকে ‘ব্যবহার’ করে তৃতীয় কোনো পক্ষের সম্পৃক্ততাও থাকতে পারে।’’
পুলিশ পুরো ভবনের সিসিটিভি, আশপাশের দোকানের ক্যামেরা, রাস্তার ফুটেজ—সবগুলো বিশ্লেষণ করছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনা শুরুর আগে ও শেষে ফ্ল্যাটে ঢুকতে এবং বের হতে কেবল ওই গৃহকর্মীকেই দেখা যায়। অন্য কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, তা জানতে ফুটেজ আরও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সিসিটিভির ভিডিও অনুযায়ী, আয়েশা নামের সেই গৃহকর্মী সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরকা পরে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে এবং ৯টা ৩৬ মিনিটে স্কুলড্রেস পরে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়। গৃহকর্মীর পরিহিত ওই স্কুলড্রেসটি নাফিসারই ছিল।
মোহাম্মদপুর থানার এক কর্মকর্তা বলেন, “ডিজিটাল ট্র্যাকিং না থাকায় সিসিটিভিই এখন মূল ভরসা। কিন্তু অনেক ক্যামেরা অকার্যকর বা নিম্নমানের। এতে ‘টাইম স্ট্যাম্প’-ও মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও জানান, ‘তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা না থাকায় আসামি শনাক্তে তদন্তে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।’ আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে শিগগিরই ‘নতুন তথ্য’ দেওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন এই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
যা রয়েছে মামলার এজাহারে
মামলার এজাহারে আজিজুল ইসলাম লিখেন, ‘আমি পেশায় একজন শিক্ষক। বর্তমানে শাহজাহান রোডের একটি বাসার ফ্ল্যাটে থাকি। গত চারদিন আগে আসামি (আয়েশা) আমার বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সোমবার ৮ ডিসেম্বর সকাল অনুমান ৭টার সময় আমি আমার কর্মস্থল উত্তরায় চলে যাই। আমি আমার কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। পরে আমি নিরূপায় হয়ে বেলা অনুমান ১১টার সময় বাসায় ফেরত এসে দেখতে পাই, আমার স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা রক্তাক্ত জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং আমার মেয়ের গলার ডান দিকে কাটা গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মেইন গেটের দিকে পড়ে আছে। আমার মেয়ের ওই অবস্থা দেখে তাকে উদ্ধার করে পরিছন্নকর্মী মো. আশিকের মাধ্যমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। আমার মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।’
এজাহারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমি বাসার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখতে পাই, উল্লিখিত আসামি (গৃহকর্মী আয়েশা) সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে কাজ করার জন্য বাসায় আসেন এবং সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় আমার মেয়ের একটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে আমি নিশ্চিত হই, অজ্ঞাত কারণে সকাল ৭টা ৫১ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময় আমার স্ত্রী ও মেয়েকে ছুরি অথবা অন্য কোনও ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করে হত্যা করেছে।
নাটোরে মা-মেয়ের দাফন সম্পন্ন
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে হত্যাকাণ্ডের শিকার মা ও মেয়ের মরদেহ মঙ্গলবার সকালে নাটোর সদর উপজেলার বড়গাছা গ্রামে লাশ পৌঁছালে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। দুপুরে বাদ জোহর জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
মা-মেয়ের মৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।







