সূর্যের জ্বলন্ত রশ্মিতে যেন টগবগে আগুন ঝরছে। নিজের উত্তাপ শক্তিমত্তা জানান দিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দিচ্ছে না শহর গ্রাম, পথ-ঘাট, সড়ক-মহাসড়ক সবখানেই সূর্যের খরতা! পিচঢালা পথ যেন জ্বলন্ত উনন! জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা এ জীবন যেন ওষ্টাগত!
গত কয়েক দিন, দেশ জুড়ে মৃদু থেকে-তীব্র তাপপ্রবাহে তেতে উঠেছে প্রাণীকূলও। বাতাসেও আগুনের ছটা। মৌসুমের প্রথম তাপ প্রবাহই চলতি মৌসুমের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। টানা কয়েকদিন ধরেই তাপমাত্রার পারদ চড়াই হয়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গায়। এখন থেকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড সীমান্তবর্তী এ জেলায়। তাপমাত্রার উত্তাপ ছড়িয়েছে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর উপরে- যাহা অতি তীব্র তাপদাহ! এরই প্রভাবে কোথাও কোথাও গলে যাচ্ছে রাস্তার পিচ! দেশের অন্য জেলাগুলিও পুড়ছে খরতাপে। পশ্চিম-দক্ষিণ অঞ্চলে বয়ে যাচ্ছে ৪১ ডিগ্রি তীব্র তাপদাহ। দেশের অন্য জেলাগুলিও পুড়ছে অতি তাপপ্রবাহে। এদিকে প্রচণ্ড গরম সহ্য করতে না পেরে অনেকেই অচেতন হয়ে পড়ছেন। দেখা দিচ্ছে নানাবিধ রোগব্যাধি ও স্বাস্থ্য সমস্যা । তীব্র গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া কেউই বের হচ্ছে না ঘর থেকে। অনেকেই বের হচ্ছেন ছাতা নিয়ে। গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কর্মজীবীরা। আবহাওয়া অফিসের মতে, দেশজুড়ে গরমের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটাকে মৃদু দাবদাহ বলে ধরা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গেলে ধরা হয় মাঝারি দাবদাহ। আর তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে ধরা হয় তীব্র দাবদাহ চলছে। ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা ও যশোহরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে তীব্র দাবদাহের চলছে।
তীব্র গরমের কারণে স্কুল-কলেজ ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যালয়ের অ্যাসেম্বলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগুনের হাল্কা এবং গরমে অতিষ্ঠ জীবন। দেশের ইতিহাসে এত বৃহৎ এলাকাজুড়ে তাপমাত্রার রেকর্ড নাই! আজও ৪০ ডিগ্রী ছাড়াতে পারে ঢাকার তাপমাত্রা। সৌদির চেয়েও ৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেশি ঢাকার। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ঝিনাইদহের শত শত নলকূপে উঠছে না পানি। মে মাসের তাপমাত্রা হবে আরও ভয়ংকর, সর্বোচ্চ হতে পারে ৪৪ ডিগ্রি । বর্তমানে তাপ প্রবাহ বইছে ৫১ জেলায়। প্রকৃতির এই আগুনঝরা তীব্র তাপদাহ বাড়িয়ে দিয়েছে; দেশজুড়ে বৈধ-অবৈধ অপরিকল্পিত ইটের ভাটা, শহর ও নগর অঞ্চলে মিল কারখানা, শপিংমল, দোকান মার্কেট, হোটেল মোটেল, বাসা বাড়ি, সর্বক্ষেত্রে এসির ব্যবহার প্রচণ্ডভাবে বেড়ে গিয়েছে। তারই সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অপরিকল্পিত বৈধ-অবৈধ ব্যাটারি সিএনজি ডিজেল, পেট্রোলচালিত গাড়ি, রিকশা, অটোরিক্সা, বিভিন্ন যানবাহন, যার প্রতিটি কর্মকাণ্ড তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কার্যকারী প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন রকমের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহারের ফলেও প্রতিনিয়ত উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। দেশজুড়ে নদী নালা, খাল বিল, পুকুর ডোবা, ভরাটের যেন একটি মহৎসব চলছে! এসব কর্মকাণ্ডই আজকের এই অনাকাঙ্খিত তীব্র তাপ প্রবাহের জন্য দায়ী। আমাদের দৈনিক কৃতকর্ম সংবরণ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান করা কষ্টসাধ্য এবং চ্যালেঞ্জিং হবে। শুধুমাত্র বৃক্ষরোপণ করেই এই সার্বিক অবস্থার উন্নয়ন করা কঠিন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকটগুলো ফসলের উপকারী পোকামাকড়ের অস্তিত্বকেও এখন হুমকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। আবার এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে কৃষিতে নির্বিচারে রাসায়নিক ও কীটনাশক প্রয়োগ। যার ফলে এই অযাচিত কীটনাশক ফসলের মাটিতে মিশে মাটির কার্বন নিঃস্ফোরণকে বাড়িয়ে তুলছে; যার কারণে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। সতর্ক থাকুন !!! সারাদেশে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ; সেই সাথে বইছে বাতাস। এই সময় অগ্নিঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। তাছাড়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। সতর্ক হোন, নিরাপদ থাকুন।
গত এক বছর গরম কমাতে যা করেছেন চিফ হিট অফিসার বুশরা আফরিন।
বুশরা আফরিনের কাজ ও প্রতিবন্ধকতা: কথা ছিল সকলকে একসাথে নিয়ে হিট মোকাবেলা করা। কিন্তু হিট অফিসারকে, সিটি কর্পোরেশনের অধীনে কাজ করতে হয়। ইচ্ছা করলেই সে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। ৩০ মিলিয়নের বেশি মানুষের বসবাস এ ঢাকা শহরে। দ্রুত বড় হচ্ছে ঢাকা নগরী। সেই সাথে পরিস্থিতিও খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তাপ নিয়ন্ত্রণে এখানে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করা দরকার। বর্তমানে ১৫ টি এলাকায় সবুজ বনায়ন প্রোগ্রাম করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় পাঁচ হাজার করে বৃক্ষরোপন করা হয়েছে। রাতারাতি কোন কিছুই পরিবর্তন করা সম্ভব নহে। ধীরে ধীরে এর সুফল পাওয়া যাবে। হিট অফিসার নিজে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেন না, তাই সময় বেশি লাগছে। টেন্ডার প্রক্রিয়াতে সময় বেশি লাগছে। বিভিন্ন কাজে আমলাতন্ত্রের জটিলতা বড় বাধা হচ্ছে। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। বেশি বেশি পানি পান করা এবং পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে আগের অভ্যাস পরিহার করতে পরামর্শ দেন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








