ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়তে শুরু করেছে বলে মন্তব্য করেছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান।
সম্প্রতি চ্যানেল আইয়ের ‘মেট্রোসেম টু দ্য পয়েন্ট’ অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করে এমন মন্তব্য করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এর সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।
প্রশ্ন- বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, অনেক ব্যাংক থেকেই বড় ধরণের লুটপাট চলেছে। সরকারি সহায়তায় বলা যায় পুরো ব্যাংকি সেক্টরে লুটপাট চলে। যার কারণে ব্যাংকগুলো বড় ধরণের বিপর্যয়ের মুখে পরেছে। পুরো বিষয়টিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- এক সময় ব্যাংক থেকে লুটপাট বলতে সরাসরি ভল্ট থেকে টাকা নিয়ে আসা বোঝানো হতো। কিন্তু এখন ব্যাংকিং সেক্টরে লুটের নিয়মটা অন্যরকম দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ব্যাংক থেকে লুটপাট করা হয় মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে। টাকাটা সরাসরি ব্যাংক থেকে বের করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই কাজগুলো কয়েকটি পার্টিকুলার বড় গ্রুপগুলো চালিয়েছে। সরকারে সর্বোচ্চ মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবাই কিন্তু বিষয়টি জানতো।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমিও বলেছি, অনেকেই বলেছেন। কিন্তু যে বা যারা এই বিষয়ে কথা বলেছেন তারা সবাই সরকার বিরোধী অথবা রাষ্ট্র বিরোধী হয়েছেন। উনারা ছিলেন দেশের শত্রু। যারা মানি লন্ডারিং করেছেন, তারা ছিলেন দেশের বন্ধু।
পটপরিবর্তনের পরে, ১১টা ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাপানো হয়েছিলো, ওইসব ব্যাংকের জন্য যে সব ব্যাংকের কোন লিকুইডিটি ছিলো না। আজকে যখন আপনারা সে সাপোর্টটা তুলে নিচ্ছেন সাথে সাথে সে সব ব্যাংক মানুষকে টাকা দেয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যে ব্যাংকে হয়তো ৫০ কোটি টাকা ডিপোজিট তার হয়তো ৮০ পার্সেন্ট টাকা লোন দেয়া হয়েছে বিশেষ গ্রুপ গুলোকে।
প্রশ্ন- গ্রুপগুলোর ক্ষেত্রে সামান্য কিছু গ্রুপের কথা সামনে আসছে, এস আলমের মতো। কিন্তু অন্যান্য গ্রুপ কারা ছিলেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- এস আলম এসেছে, বেক্সিমকো ছিলো। আরো অনেক গ্রুপ ছিলো যাদের পলিটিকাল অ্যাফিলিয়েশন ছিলো যারা সুবিধা নিয়েছে। হয়তো না হিসেবে আসছে না, কিন্তু তারা সেখানে আছে। সরকারি ব্যাংক শেষ করে অনেকে পেয়েছে। শুধু এস আলমের ১৯ হাজার কোটি টাকা ক্লাসিফিকেশন হয়েছে। গভর্ণর সাহেব বলেছেন ১৭ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে চলে গিয়েছে। আমাদের এখানে যেভাবে হয়েছে, পৃথিবীর কোথাও সম্ভবত এভাবে হয় নাই, যেভাবে আমাদের দেশে হয়েছে। এটা হয় শুধুমাত্র স্টেট লেভেল পেট্রোনাইজেশনের জন্য।

প্রশ্ন- অভিযোগ আছে যারা এই লুটপাটের সাথে জড়িত ছিলেন তারা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। এ বিষয়ে আপনি কী বলতে চান।
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- গত ১৬-১৭ বছর ধরে পুরো সিস্টেম গট পলিউটেড। সেখানে গভর্নন্সের কোন কিছুই আর এখানে অবশিষ্ঠ নাই। যেভাবে স্টেট লেভেল থেকে ইন্সট্রাকশন এসেছিলো, ঠিক সেভাবেই ব্যাংকগুলো চলেছে। আপনি ওভারনাইট সবগুলো ফেলে দিতে পারবেন না। আপনাকে প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে হবে। বর্তমানে বোর্ড লেভেলে কিছু মানুষকে দেয়া হয়েছে যারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিসেবে এখন এসছেন। যারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যাংকিং সেক্টরে যুক্ত ছিলেন তাদেরকে দেয়া হয়েছে। আস্তে আস্তে বিষয়টা নিচের দিকে যাবে।
আপনি যেটা বলছেন, ম্যানেজমেন্ট লেভেলে যারা দুর্নীতির সাখে জড়িত ছিলেন, তারা এখনো আসছেন না কেন। সরকারের মাত্র ১০০ দিন পার হলো। তারা হয়তো সামনে আরো স্টেপস নেবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে বেশ কিছু স্টেপস নিয়েছে। এর মধ্যে একটি, কিভাবে টাকা গুলো ফেরত আনা যায়। আরেকটা হচ্ছে, ফরেনসিক রিপোর্ট করা। আরেকটি হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফর্মিংয়ের কাজ। বাংলাদেশ ব্যাংককে রিইন্সট্রেংথনিং প্রোগ্রাম। যে বিষয়গুলো আগে এসেছে, সেই বিষয়গুলো যেন না ঘটে। সেই প্রসেসটা আগে রিভিউ করা হবে। যেন ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। এবং সে জন্য কিন্তু একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। আইএমএফ ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাথে কথাবার্তা বলছে, বিভিন্ন কনসাল্টেন্সি নিচ্ছে। এভাবে এই প্রসেসগুলোকে ঠিক করা হবে।
প্রশ্ন- টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তারা বৈঠক করছে। আপনাদের সাথে তারা বসছেন কী?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা বসছে। উনারা কাজ শুরু করেছেন। উনারা আমাদের দুই একজনের সাখে বসেছেন। ফান্ডিং এবং কিছু বিষয় ঠিক করে আমাদের সাথে বসা শুরু হয়েছে।
প্রশ্ন- আপনি বলছিলেন, বাইরে পাচার হওয়া টাকা দেশে আনার বিষয়ে কথা শুরু হয়েছে। আপনারা বলছেন পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আনার বিষয়ে আপনারা আশাবাদী। পাচার হওয়া টাকাগুলো কী ফেরত আসবে? পাচার হওয়া টাকা গুলো দেশে ফেরত না আসলে আপনারা কী কোন সমস্যায় পরবেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- পুরো বিষয়টি আসলে অনেক সময় সাপেক্ষ। আপনারা এরই মধ্যে দেখেছেন যে এর মধ্যে এস আলম বলেছে তারা প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে কেস ফাইল করবে। লোকালি যে অ্যাসেটগুলো আছে সেই অ্যাসেট রিকভারের জন্য যত দ্রুত যে পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যেগুলো বাইরে চলে গেঝে, সেগুলোকে আনা ডিফিকাল্ট। যে টাকাটা বাইরে গেছে এটা দিয়ে কোন কিছু কেনা হয়েছে বা ইনভেস্ট করা হয়েছে। এই বিষয়টার সাথে সে দেশের সাথে বাই ল্যাটারাল আলোচনার একটা বিষয় আছে। সেই টাকাটা ফেরত আনার বিষয়ে।
তো এই ক্ষেত্রে যে ডিলেটা হচ্ছে সে ক্ষেত্রে হয়তো কিছু ব্যবস্থা নেয়া হবে। অলরেডি বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের কিছু ডিডাকশন করেছে। আমরাও কিছু আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপোর্ট নিয়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়া গেলে ব্যাংক গুলোর রিপোর্ট পেলে ব্যাংক গুলোর স্বাস্থ্য সম্পর্কে আপনারা জেনে যাবেন। কত ঋণ খেলাপী হলো আপনি জানতে পারবেন। এবং হয়তো তারপর দে উইল গো ফর মার্জার। এবং যে সব গ্রুপ পলাতক, তাদের শেয়ার গুলা সেন্ট্রাল ব্যাংক অ্যাকুয়ার করবে। অ্যাকুয়ার কের সেগুলোকে লোকাল অথবা ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টার্সের কাছে হ্যান্ড ওভার করবে। এর মাধ্যমে কিছুটা টাকা উঠানোর চেষ্টা করা হবে। কিছুদিন আগে ইসলামী ব্যাংক বলেছে তারা শেয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা পাবে। এইভাবে বিভিন্ন ব্যাংক হয়তো মার্জারে যাবে অথবা ক্যাপিটাল রিজেনারেট করা হবে, এভাবে ক্ষতিগুলো পূরণ করার চেষ্টা করা হবে।
প্রশ্ন- আপনি কিছুক্ষণ আগে বললেন, দেশের অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ মহল এমন কী সাবেক প্রধানমন্ত্রী অথবা শেখ রেহানার মতো মানুষও জড়িত। সেই সময় আপনাদের কী করণীয় ছিল?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- দেখুন সে সময় আপনি রাষ্ট্রের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে কিছু করতে পারতেন না। আপনি আয়নাঘরের কথা শুনেছেন। আপনি যখন কোন কথা বলতে যাচ্ছেন আপনি গুম হয়ে যাচ্ছেন। আপনাকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া হচ্ছে। আমরা তখন জানতাম কিছু হচ্ছে। কিন্তু এতটা বিশাল এই তথ্য আপনার কাছেও ছিলো না। আমার কাছেও ছিলো না। আজকে আমরা যেই আলোচনা করছি সেই আলোচনা তখন সম্ভব ছিলো না। এই দেশে আপনার পরিবার পারিজন নিয়ে থাকতে হলে এমন পরিস্থিতিতে আপনি অনেকটাই জিম্মি।
প্রশ্ন- আমরা দেখেছি বিগত সময়ে আপনাকে দুদকও ডেকেছিল এবং প্রশাসনের মুখোমুখিও আপনাকে দাঁড়াতে হয়েছিলো। সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করতে চান?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- দেখুন এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার কোন উপায় নেই। এই দেশটা একটা মাফিয়া স্টেটে পরিণত হয়েছিলো। মাফিয়া স্টেটে পরিণত হলে কী হয়! আমাদের আলাদা পাসপোর্ট নেই। আমাদের এ দেশেই থাকতে হবে।
অনেকেই তো চলে গেছেন! তাহলে তো স্কেপিস্ট হয়ে গেলেন। আমরা দেশে থেকেই কাজ করে যেতে চেয়েছি। আপনি চলে গেলে সেটা কি কোন সলিউশন হলো? আমরা দেশে থেকে চেষ্টা করে গেছি আমি যে ব্যাংকটাতে আছি সেই ব্যাংকটা যেন ভালোভাবে চলে। সেই ব্যাংকের বোর্ডটা যেন ভালোভাবে চলে। আমি চলে গেলে সেই সব জায়গা গুলোতে অন্যকেউ আসতে পারতো যারা ভালো কিছু নিয়ে আসবে না।
আমি চেষ্টা করেছি উইথ সাপোর্ট অফ দ্য বোর্ড, সেই ব্যাংকগুলোকে একটা ভালো জায়গা রাখাতে। আলহামদুল্লিাহ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নাম সেই ব্যাংকগুলোর তালিকায় নেই যাদের নামে কমপ্লেইন আছে। আমরা ট্রান্সপারেশনটাকে খুব সাপোর্ট দিয়ে করেছি। আমরা প্রমোট করে গভর্নেন্স কে প্রমোট করেছি আমাদের বোড অফ ডাইরেক্টরসকে করেছি। আমরা ম্যানেজমেন্টকে রক্ষা করতে পেরেছি।
প্রশ্ন- যেসব টাকাগুলো পাচার হয়ে গেছে, সেই টাকাগুলো যদি না আসে গ্রাহকদের মধ্যে একটা আস্থাহীনতা তৈরী হয়ে যাচ্ছে না? বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে ভবিষ্যতে মোকাবেলা করবেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান- লুটপাটের ক্ষেত্রে, ক্যাশ তো আর বাংলাদেশের বাইরে চলে যায় নাই। যেটা হয়েছে হুন্ডি হয়েছে। তা ক্যাশটা কেউ নিয়েছে বাংলা টাকায়, যেহেতু বাংলা টাকার তো ইন্টারন্যাশনাল এক্সটেন্স নাই। ক্যাশ টাকা ট্রাঙ্ক বা স্যুটকেসে করে বাইরে চলে যায় নাই। রেমিটেন্স কিন্তু প্রবাহ কমে গেছিলো। উল্টো দিকে ডলারের দাম বাড়ছিলো। ওভারসিজ বা মিডল ইস্টে, ওখানে ওরা ডলারটা রেখে দিতো। ওই টাকাটা আমি পেয়ে গেলাম। আর আমি এখান থেকে বললাম এইখানে তোমার টাকা দিয়ে দেয়া হচ্ছে। এভাবেই মূলত হুন্ডিটা চলতো। এবং এর ফলে ডলারের দাম এখানে বেড়ে গেছিলো।
আমরা আস্থার জায়গা কি করছি! যেটা সরকারও কাজ করছে, রিফরমের কাজ করছে তার মাধ্যমে যে ব্যাপারটা হবে, যেসব ব্যাংক ভালো করেছিলো সেসব ব্যাংকে কিন্তু ডিপোজিট বাড়ছে।
ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা বাড়ছে। অ্যাট দ্য ইন্ড আপনার টাকা তো কোথাও রাখতে হবে। আপনি টাকা তো ঘরে রাখতে পারবেন না। ঘরে রাখলে তো আপনি তো সেভ থাকবেন না। গুড, বেটার ব্যাংকে, যেমন আমার ব্যাংকে টাকা বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। আমার টাকা বেড়েছে। অন্য ভালো ব্যাংকেও টাকা বাড়ছে। আশা করা যায় ধীরে ধীরে অন্যান্য ব্যাংকগুলোও গুড গভর্নেন্সের মাধ্যমে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।







