অনলাইনে সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে পেন্টাগনের বেশ কিছু গোয়েন্দা নথিপত্র। কীভাবে নথি ফাঁস হয়েছে তারই হিসেব চলছে এখন। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে শত্রু ও মিত্র দেশগুলোর ওপর গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে আসছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পর্কিত গোপনীয় এসব নথি কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল, তা তদন্ত করতে নেমেছে দেশটির বিচার বিভাগ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ঘটনার বিস্তারিত।
যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো বলছে, ফাঁস হওয়া এসব নথি নিয়ে কর্মকর্তারা খুব সাবধানেই পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র বলেছেন, প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মীরা এর সত্যতা যাচাই করে দেখছে। তবে নথিগুলো জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, অন্তত কিছু নথিতে ভুল তথ্য থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও বিস্তারিত এখন প্রকাশ হয়নি তবে এটি স্পষ্ট যে পরিস্থিতি মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
নথিগুলো প্রথম কোথায় ফাঁস হয়েছে
অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট বেলিংক্যাট অনুসারে, নথিগুলো প্রথম ডিসকোর্ডে ছবি আকারে পোস্ট করা হয়। ডিসকোর্ড একটি অনলাইন ভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম যা গেমারদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
ছবিগুলো পর্যালোচনা করা কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, সম্ভবত নিরাপদ একটি স্থান থেকে ছবিগুলো তোলা হয়েছিল। মনে হচ্ছে তাড়াহুড়োর মধ্যে সেগুলো দলাপাকিয়ে প্রথমে পকেটে গুঁজে ফেলা হয়েছিল। পরে একটি নিরাপদ স্থানে বের করে নথিগুলোর ছবি তোলা হয়।
বেলিংক্যাট ডিসকোর্ডে ফাঁস হওয়া নথিগুলো খুঁজে বের করেছে। তাদের গবেষণায় বলা হয়, নথিগুলো মার্চ মাসেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাঁস হয়েছিল।এবং আমরা প্রমাণ পেয়েছি যে কিছু নথি ডিসকোর্ডে জানুয়ারিতেও পোস্ট করা হয়েছিল।
কিছু নথিতে ‘গোপনীয়’, ‘অতি গোপনীয়’ উল্লেখ করা ছিল। কিছুতে ‘বিদেশিদের কাছে প্রকাশযোগ্য নয়’ বলেও চিহ্নিত করা রয়েছে। যার অর্থ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের গুপ্তচর সংস্থাসহ বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তথ্য ভাগাভাগি করা যাবে না।
বেলিংক্যাটের মতে, মূলধারার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার আগে নথিগুলো ডিসকোর্ড থেকে অনলাইন ইমেজবোর্ড ফোর-চান এ ছড়িয়ে পড়ে।
নথিগুলো কারা ফাঁস করতে পারে
মার্কিন বিচার বিভাগ ইতিমধ্যে এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু অনেক জল্পনা-কল্পনার মধ্যেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফাঁসের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
নথিতে থাকা তথ্যের শ্রেণীবিভাগ এবং ভৌগলিক বিস্তৃতির কারণে কেউ কেউ অনুমান করতে পেরেছে যে ফাঁসকারী কোনো আমেরিকান। যদিও দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, আসল পরিচয় লুকানোর জন্য নথিগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্তকারীরা বেশ কিছু বিষয়ে লক্ষ্য রাখছেন। একজন অসন্তুষ্ট কর্মচারী থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ হুমকি এবং যারা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে দুর্বল করতে চেয়েছিল।
ফাঁস হওয়া নথিগুলো কীভাবে তার হাতে এসেছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় উন্মোচন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, আমরা তদন্ত চালিয়ে যাব যতক্ষণ না এর উৎস এবং পরিমাণ সম্পর্কে জানতে পারছি।
টেক্সাসের রাইস ইউনিভার্সিটির একটি বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেছিন, ফাঁসের উৎস সম্পর্কে চলমান তদন্ত তীব্র গতিতে এগোচ্ছে।
নথিগুলো কি আসল
রোববার পেন্টাগন বলেছে অন্তত কিছু নথিতে সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা বিভাগ নথিগুলোর সত্যতা নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও তারা দাবি করেছে, কিছু তথ্যকে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। কোন অংশে পরিবর্তন করা হতে পারে তা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা কিছু না বললেও একটি নথিতে দেখা যায়, ইউক্রেনে রাশিয়ান সৈন্যদের মৃত্যুর সংখ্যা মার্কিন প্রশাসনের দেওয়া সংখ্যার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অন্যদিকে ইউক্রেনের সৈন্যদের মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় অনেক বেশি বলে।
পেন্টাগনের মূখপাত্র বলেন, এই ধরণের তথ্য কীভাবে এবং কাদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংবেদনশীল এই তথ্য শুধু যে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাতে প্রভাব ফেলবে তা নয়, বরং মানুষের জীবননাশের কারণও হতে পারে।
ইউএস ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবি জানান, প্রশাসন নিশ্চিত নয় যে আগামী দিনে আরও নথি সামনে আসবে কিনা। এ সময় তিনি বলেন, আমরা জানি না এর পেছনে কারা রয়েছে? আমরা জানি না এর উদ্দেশ্য কী?
নথিগুলোতে যা আছে
নথিগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াও আমেরিকা-সাউথ কোরিয়া এবং ইসরায়েলসহ তার মিত্রদের সম্পর্কে গোপন তথ্য রয়েছে।
ইউক্রেন: নথিগুলো থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ‘সিগন্যাল’ ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কির কথোপকথন পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা ইউক্রেনীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক ব্যাটালিয়নের আকারের দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।
রাশিয়া: নথিগুলো থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র কতটা বিস্তৃত পরিসরে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও রাশিয়ার ভাড়াটে সৈনিকদের প্রতিষ্ঠান ওয়াগনার গ্রুপে গোয়েন্দাগিরি করছে। নথিগুলো রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ এর অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনার বিষয়কেও সামনে নিয়ে এসেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: একটি নথিতে দেখা যাচ্ছে, রাশিয়ান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তেল সমৃদ্ধ সংযুক্ত আরব আমিরাতকে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে একসাথে কাজ করতে রাজি করেছিল।
আমিরাত সরকার রাশিয়ার গোয়েন্দাদের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক গভীর করার অভিযোগকে ‘স্পষ্টভাবে মিথ্যা’ বলে খারিজ করে দিয়েছে।
মিশর: একটি ফাঁস হওয়া নথি দেখায়, মিশর রাশিয়াকে রকেট এবং যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করার পরিকল্পনা করেছিল। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং মিশরীয় সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে কথোপকথনের সারসংক্ষেপ রয়েছে নথিতে।
সাউথ কোরিয়া: অন্য একটি নথিতে সাউথ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি ইউন সুক-ইওলের শীর্ষ সহযোগীদের মধ্যে হওয়া অভ্যন্তরীণ আলোচনা থেকে জানা যায় যে, আর্টিলারি শেল সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্র সিউলের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে, যা ইউক্রেনে পাঠানো হবে।
এটি আরও ইঙ্গিত করে যে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করেছে, যদিও সাউথ কোরিয়ার কর্মকর্তারা নথিতে থাকা বিবরণগুলো অসত্য বলে দাবি করেছে।
ইসরায়েল: নথিতে দেখা যায়, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা (মোসাদ) তার কর্মকর্তাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে দুর্বল করার জন্য সরকারের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিতে উৎসাহিত করছে।
মিত্রদের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও তথ্য ফাঁসের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করে দেখছেন, এ থেকে তাদের নিজেদের গোয়েন্দা সূত্র ও পদ্ধতি ফাঁস হয়ে গেছে কিনা।
‘ফাইভ-আইজ’ভুক্ত দেশের এক কর্মকর্তা ইউক্রেন যুদ্ধের ফাঁস হওয়া তথ্য নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, এই নথি ফাঁস ইউক্রেনকে দুর্বল করে দেবে
এ বিষয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উপদেষ্টা মিখাইলো পোদোলিয়াক নিজের টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলেন, তার বিশ্বাস ফাঁস হওয়া এই নথিগুলো মিথ্যা। মূলত রাশিয়ার ছড়ানো মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এসব নথি প্রস্তুত করা হয়েছে।







