যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যে সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে পাকিস্তান। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এটিই প্রথম দৃশ্যমান সামরিক পদক্ষেপ, এমন সময় যখন ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোন সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে আলোচনা।
আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার (১১ এপ্রিল) পূর্বাঞ্চলের কিং আবদুলআজিজ এয়ার বেজে পাকিস্তানের যুদ্ধ ও সহায়ক বিমান অবতরণ করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে এই মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে-এক দেশের ওপর হামলাকে অন্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে রিয়াদ সফরে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
এদিকে, যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সময়ই ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা চলছিল। উভয় পক্ষের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নিচ্ছেন এবং পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান উভয় পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, মার্চের শুরুতে তিনি ইরানকে সতর্ক করে বলেন, রিয়াদের সঙ্গে চুক্তির কারণে ইসলামাবাদ বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে। তবে ইরান সৌদি ভূখণ্ডকে হামলার জন্য ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা চেয়েছিল, যা তিনি আদায় করতে সক্ষম হন।
তবুও সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও একটি মার্কিন দূতাবাস ভবনে ইরানি হামলা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তির আওতায় ইরানি হামলা বন্ধে করণীয় নিয়ে আলোচনার জন্য মার্চের শুরুতে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির রিয়াদ সফর করেন।
যুদ্ধবিমান পাঠানোর চার দিন আগে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সকে ফোন করে পাকিস্তান “কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে” থাকার অঙ্গীকার করে। পাশাপাশি পাকিস্তানের জন্য ঘোষিত ৫ বিলিয়ন ডলারের সৌদি বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়নে সম্মত হয় দুই দেশ।
শনিবার এর আগে সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শরিফ, ইসহাক দার ও আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ পাকিস্তানি কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া দেশটি বারবার ইসলামাবাদকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ গুল আল জাজিরাকে বলেন, এই মোতায়েন সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য নয়, বরং ইরানের কাছে পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরার একটি বার্তা। তার ভাষায়, মাত্র তিনটি যুদ্ধবিমান সামরিকভাবে বড় কোনো পার্থক্য গড়বে না। এটি মূলত তেহরানকে আলোচনায় নমনীয় হওয়ার বার্তা।
অন্যদিকে, আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান এই পদক্ষেপকে ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, এটি ইরানকে একটি বার্তা যদি সমঝোতায় না আসে এবং সংঘাত আবার বাড়ে, তাহলে পাকিস্তান সৌদি আরবের দিকে আরও ঝুঁকতে পারে এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করতে পারে।







