ট্রাভেল এজেন্সি খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, প্রতারণা ও গ্রাহক হয়রানি বন্ধে সরকার ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ-২০২৬ জারি করেছে। অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ সংশোধন করা হয়েছে। এর আওতায় অনলাইন ও অফলাইন—উভয় ধরনের ট্রাভেল এজেন্সির কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও নিয়ন্ত্রিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আকাশপথে যাত্রী পরিবহনে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, টিকিটের ন্যায্যমূল্য বাস্তবায়ন, গ্রাহকসেবা উন্নয়ন এবং সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী কর্মীদের বিদেশগমনে হয়রানি রোধই এই অধ্যাদেশের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বড় ধরনের প্রতারণার ঘটনার পর কঠোর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে কয়েকটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি বিপুল অঙ্কের গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠে। এ সময় ফ্লাইট এক্সপার্ট, এফইবিডি, মক্কা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ সরকারের নজরে আসে। পাশাপাশি চটকদার বিজ্ঞাপন, ভুয়া বুকিং, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে অযৌক্তিক মূল্যে টিকিট বিক্রির অভিযোগও উঠে আসে।
নতুন অধ্যাদেশে এসব অনিয়ম বন্ধে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে এক কোটি টাকা এবং অফলাইন ট্রাভেল এজেন্সির জন্য তা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এখন থেকে টিকিটে বাধ্যতামূলকভাবে ট্রাভেল এজেন্সির নাম, নিবন্ধন নম্বর এবং টিকিটের প্রকৃত মূল্য উল্লেখ করতে হবে। এতে গ্রাহক সহজেই দায়ী এজেন্সিকে শনাক্ত করতে পারবেন এবং প্রতারণার ঝুঁকি কমবে।
এছাড়া ভুয়া বা ফলস বুকিং দিয়ে আসন আটকে রাখা, জিডিএস বা এয়ারলাইন্স সিস্টেমের আইডি-পাসওয়ার্ড শেয়ার করা এবং অনুমোদনহীন উৎস থেকে টিকিট সংগ্রহকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষায় নতুন অধ্যাদেশে বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় দেশ থেকে টিকিট কেনাবেচা, গ্রুপ বুকিংয়ে যাত্রীর তথ্য পরিবর্তন, কনসলিডেটেড পেমেন্টের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং টিকিটে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকার মতো অনিয়মগুলোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারের ধারণা, এতে প্রবাসী কর্মীরা প্রতারণা থেকে সুরক্ষা পাবেন।
অগ্রিম অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বড় এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ছোট এজেন্সি বা গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্যাশব্যাক ও লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন অধ্যাদেশে যেকোনো ধরনের অগ্রিম অর্থ আদায়কে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাস্তির বিধানেও এসেছে কঠোরতা। অধ্যাদেশ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর অপরাধে নিবন্ধন সনদ সাময়িক স্থগিত বা বাতিলের পাশাপাশি জনস্বার্থে অভিযুক্ত ব্যক্তির দেশত্যাগে সাময়িক নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এই অধ্যাদেশে দুর্বৃত্তদের দুর্বৃত্তায়ন কঠিন করা হয়েছে। সিন্ডিকেট বন্ধ করতে যা যা প্রয়োজন, সবই এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরকারের মতে, ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ-২০২৬ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, ভোক্তা ও প্রবাসী কর্মীদের আস্থা বাড়বে এবং সৎ ব্যবসায়ীরা আরও নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। সরকারের লক্ষ্য কোনো ব্যবসা বন্ধ করা নয়, বরং একটি স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভ্রমণ ও পর্যটন খাত গড়ে তোলা।








