ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এই ত্রিশ দিনে প্রশংসার পাল্লাই ভারি সরকারের। ভোটের কালি না শুকাতেই প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে হাত দিয়েছেন।
এই এক মাসে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়ায় সরকার প্রশংসা পেলেও কিছু সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য ঘিরে সমালোচনাও তৈরি হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি চালু করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারকে শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। এখন পর্যন্ত সরকারের পদক্ষেপ ইতিবাচক। ছয় মাস গেলে তাদের কর্মকাণ্ড আরও স্পষ্ট হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। ১০ মার্চ এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে ৩৭ হাজার ৫৬৪ জনকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে এই কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পেয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক নারী সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
ধর্মীয় নেতাদের সম্মানি
১৪ মার্চ সরকার দেশের মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সরকারি সম্মানি প্রদান কর্মসূচি শুরু করে। এর ফলে মসজিদ, মন্দির, বিহার ও গির্জার ধর্মীয় সেবাদানকারীরা প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় ভাতার আওতায় আসেন।
এই উদ্যোগকে সামাজিক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
খাল খনন কর্মসূচি
নির্বাচনি প্রচারণায় দেওয়া আরেকটি প্রতিশ্রুতি ছিল খাল খনন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দিনাজপুরে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সারাদেশে ৫৪ জেলায় খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এই কর্মসূচিকে অনেকেই সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর সময়ের খাল খনন উদ্যোগের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
আসছে কৃষক কার্ড
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে আটটি জেলার নয়টি উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার কৃষক এই কার্ড পাবেন।
ট্রাফিক ব্যবস্থায় নতুন দৃষ্টান্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিআইপি প্রটোকল কমিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজধানীতে তার গাড়িবহরের সংখ্যা ১৩–১৪টি থেকে কমিয়ে চারটিতে নামানো হয়েছে। এই পদক্ষেপে নগরীর যান চলাচলে কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ মাসের শুরুতে ভারত সফর করে এসেছেন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী।
সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ ভারতের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনীতিক সম্পর্কে আড়াই বছর ধরে যে বরফ জমে, মেজর জেনারেল কায়সার রশিদের এই সফরে তা গলার আভাস দেখছে ভারতের সংবাদপত্রগুলো।
বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা
সরকার গঠনের পরপরই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে, ফলে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই এবং কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে আকস্মিক পরিবর্তনও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গভর্নর পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তে অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের একাংশ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মন্ত্রীদের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা
সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে মালিক–শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তবে মন্ত্রীদের কথার লাগাম টানতে চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ইতিমধ্যে তিনি মন্ত্রীদের নির্দেশনা দিয়েছেন, কথা কম বলে কাজে মনোযোগ দিতে। এমনকি মন্ত্রীদের ১৮০ দিন সময় বেঁধে দিয়ে তাদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন তখন তারই মন্ত্রিপরিষদের একজনের চাঁদাবাজি নিয়ে এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক।
বিশ্লেষকদের মত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক মাসের কর্মকাণ্ডে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ দেখা গেলেও সামগ্রিক মূল্যায়নের জন্য আরও সময় প্রয়োজন। সাধারণত ছয় মাস পর সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
এই সূচনাকে টেকসই সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর বাস্তবায়ন। পাশাপাশি দুর্নীতিকে শক্ত হাতে দমন করারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সার্বিকভাবে, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগে সরকারের প্রশংসা থাকলেও নীতি ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।








