বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে বিশ্ব ক্যান্সার দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)-এর উদ্যোগে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পাশে আছি’ অ্যাপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পরীবাগ সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে এটি সম্পন্ন হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত ক্যান্সার যোদ্ধাদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর ছোট্ট শিশু তিতলির কণ্ঠে আবেগঘন সংগীত ‘এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে’ পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, এনডিসি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিসিসিএফ-এর প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ।
অনুষ্ঠানে ক্যান্সার চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রোকশানা আফরোজ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মমতাজ আহমেদ বলেন, “ক্যান্সার এখন শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও মানসিক সংকট। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি এবং তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যায়। চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আরও ইতিবাচক হয়।
সিসিসিএফের ‘পাশে আছি’ অ্যাপ একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী উদ্যোগ, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের উদ্যোগ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ যেমন জরুরি, তেমনি রোগী ও তার পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক সমর্থন ও সঠিক কাউন্সিলিং ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা গ্রহণের সক্ষমতা ও জীবনমান উন্নত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এ ক্ষেত্রে সমাজ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও পথিকৃত ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলি বলেন, “ক্যান্সার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল রোগ, যার প্রভাব শুধু রোগীর ওপর নয়, পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সহায়তা এবং সামাজিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। সিসিসিএফের ‘পাশে আছি’ অ্যাপ ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর একটি সময়োপযোগী ও মানবিক উদ্যোগ, যা দেশের স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
সভাপতির বক্তব্যে সিসিসিএফ-এর প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ বলেন, “সিসিসিএফ ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, স্বজন হারানো পরিবার, কেয়ারগিভার এবং চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সংগঠন। আমরা বিশ্বাস করি, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই শুধু ওষুধ বা চিকিৎসা দিয়ে সম্ভব নয়—মানসিক শক্তিই পারে মানুষকে বাঁচার প্রেরণা দিতে। এই বিশ্বাস থেকেই ‘পাশে আছি’ অ্যাপের যাত্রা শুরু।”
তিনি আরও বলেন, “এই অ্যাপের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সিলিং এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সহায়তা পাবেন। সিসিসিএফের নিজস্ব ক্যান্সার সার্ভাইভার ও কাউন্সিলিং বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞরা এই সেবা প্রদান করবেন।”
অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পাশে আছি’ অ্যাপটির উদ্বোধন করা হয়। অ্যাপটি ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অনলাইন কাউন্সিলিং, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যা ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ে তাদের মানসিক শক্তি জোগাবে। অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোরে শীঘ্রই পাওয়া যাবে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল মুগ্ধতা স্মৃতি বৃত্তি প্রদান। ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু অথবা যেসব পরিবারের কোনো সদস্য ক্যান্সারে আক্রান্ত—এমন পাঁচজন শিশুকে শিক্ষা সহায়তা হিসেবে এই বৃত্তি প্রদান করা হয়। বৃত্তিপ্রাপ্ত শিশুদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সহায়তা তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার পাশাপাশি তাদের মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্য নিয়েছে সিসিসিএফ। মুগ্ধতার বাবা নিজের অভিব্যক্তিতে দেশেই সবার জন্য সুলভে জনবান্ধব ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য জোর দাবি করেন। বৃত্তিপ্রাপ্ত একজন সন্তানের ক্যান্সার শনাক্তকরণের পরে চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ক্যান্সার সার্ভাইভার, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা ক্যান্সার প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উল্লেখ্য, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ) ক্যান্সারাক্রান্ত, সার্ভাইভার, ক্যান্সারে স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক, অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। সিসিসিএফ ২০২৩ সালের জুন মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে। সংগঠনটি ক্যান্সারাক্রান্তদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা প্রদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছে। ইতোমধ্যে সিসিসিএফ সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয়েছে (নিবন্ধন নম্বর: ঢ-০১০০৭৫) এবং এর ওয়েবসাইট www.cccfbd.org.
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জাহান-ই-গুলশান, ক্যান্সার সার্ভাইভার ও সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ)।
তিনি বলেন, “আমি নিজে একজন ক্যান্সার সার্ভাইভার হিসেবে জানি, মানসিক শক্তি, সচেতনতা এবং সহমর্মিতা একজন রোগীর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সিসিসিএফ সেই মানসিক সহায়তা ও সচেতনতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ক্যান্সারাক্রান্ত এবং তাদের পরিবার একে অপরের পাশে দাঁড়ায়।”








