গ্রপপর্বে নয়ে নয়। সেমিফাইনালেও দুর্দান্ত ভারত। বিরাট কোহলির রেকর্ড মাল্যে কিউইদের সামনে বড় লক্ষ্য দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। পরে মোহাম্মদ শামির ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে রাত রাঙিয়ে শিরোপার মঞ্চে পা রেখেছে ভারত। কিউইদের ৭০ রানে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করেছে রোহিত শর্মার দল।
বিশ্বকাপের চলতি আসরের প্রথম সেমিতে টসে জিতে আগে ব্যাটের সিদ্ধান্ত নেন ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা। কোহলির রেকর্ডময় সেঞ্চুরি ও শ্রেয়াস আয়ারের শতকে নির্ধারিত ওভার শেষে ৪ উইকেটে ৩৯৭ রানের সংগ্রহ গড়েছে স্বাগতিক ভারত। জবাবে নেমে এই ড্যারিল মিচেলের সেঞ্চুরিতে ৪৮.৫ ওভারে ৩২৭ রানে গুটিয়ে যায় নিউজিল্যান্ড।
ভারতের হয়ে দুর্দান্ত বল করেছেন মোহাম্মদ শামি। ৯.৫ ওভার বল করে ৫৭ রান খরচায় সাত কিউই ব্যাটারকে ফিরিয়েছেন তিনি। চলতি বিশ্বকাপে বোলাদের মাঝে এটাই সেরা ফিগার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে পঞ্চম বোলার হিসেবে সাত উইকেট শিকার করেছেন তিনি। শামির আগে গ্লেন ম্যাকগ্রা, অ্যান্ডি বিকেল, টিম সাউদি ও উইনস্টন ডেভিস নেন সাতটি করে উইকেট।
চলতি আসরে তিনবার পাঁচ উইকেট দেখা পেয়েছেন তিনি। একমাত্র বোলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ তিনবার পাঁচ বা ততোধিক উইকেট শিকার করেছেন শামি। এর আগে এক আসরে দু’বারের বেশি পাঁচ উইকেট শিকার করতে পারেনি কেউ। চলতি আসরে এখন পর্যন্ত ৬ ইনিংসে ২৩ উইকেট নিয়েছেন শামি। তাতেই চলতি আসরের সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক বনেছেন তিনি।
হিমালয়সম লক্ষ্য তাড়ায় নেমে নিউজিল্যান্ডের শুরুটা অবশ্য ভালো হয়নি খুব একটা। ৩৯ রানেই দুই ওপেনর রাচিন রবীন্দ্র ও ডেভন কনওয়ের উইকেট হারায় তারা। এরপর হাল ধরেন উইলিয়ামসন ও ড্যারিল মিচেল। ১৮১ রানের জুটি গড়েছেন দুজনেই।
২৯তম ওভারে ওভারে অবশ্য উইলিয়ামসনকে আউট করার সুযোগ হাতছাড়া করে ভারত। বুমরাহ’র স্লোয়ারে উড়িয়ে মারতে যান উইলিয়ামসন। লং অনে ক্যাচ ছেড়ে দেন মোহাম্মদ শামি।
৩৩তম ওভারের প্রথম বলে আটটি চার ও পাঁচ ছক্কায় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মিচেল। পরের বলেই উইলিয়ামসনকে ফেরান মোহাম্মদ শামি। আটটি চার ও এক ছক্কায় ৭৩ বলে ৬৯ রান করেন নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক। ওভারের চতুর্থ বলে ফের আঘাত হানেন শামি। টম লাথাম ফিরে যান রানের খাতা না খুলেই।
এরপর গ্লেন ফিলিপসকে নিয়ে ৭৫ রানের জুটি গড়েন মিচেল। ৪৩তম ওভারে জুটি ভাঙেন বুমরাহ। ফিলিপস ৩৩ বলে ৪১ রান করেন। ৪৬তম ওভারে ড্যারিল মিচেল ফিরে যান শামির শিকার হয়ে। নয়টি চার ও সাতটি ছক্কায় ১১৯ বলে ১৩৪ রান করেন মিচেল।
মিচেল ফেরার পর আর কেউ দাঁড়াতে পারেনি শামির বোলিং তোপে। শেষ অবধি ৩২৭ রানে গুটিয়ে গিয়ে সেমিফাইনাল থেকেই বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করতে হয়েছে উইলিয়ামসনদের।
ভারতের হয়ে শামির ৭ উইকেটের পাশাপাশি জাসপ্রীত বুমরাহ, কুলদীপ যাদব ও মোহাম্মদ সিরাজ একটি করে উইকেট নেন।
এর আগে ব্যাটে নেমে অনন্য ইতিহাস গড়েছেন বিরাট কোহলি। সময়ের সেরা ব্যাটার ওয়ানডেতে প্রথম হিসেবে ৫০তম সেঞ্চুরির দিনে ভেঙেছেন শচীন টেন্ডুলকারের ‘তিন রেকর্ড’।
ওয়াংখেড়ে আজ যেমন ছিল তারকাময়, গ্যালারিতে ছিলেন শচীন-বেকহ্যাম-আনুশকা, ছিল বলিউড তারার ঢল, তেমনি ২২ গজ ছিল কোহলিময়। ভারতের কিংবদন্তি সাবেক ব্যাটার শচীনকে (৪৯ শতক) গ্যালারিতে সাক্ষী রেখে ওয়ানডেতে প্রথম ব্যাটার হিসেবে ৫০তম সেঞ্চুরির মালিক হয়েছেন কোহলি। গত ৫ নভেম্বর ৩৫তম জন্মদিনে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ ৪৯ সেঞ্চুরির রেকর্ডে শচীনের পাশে নাম লিখিয়েছিলেন কোহলি।
৪২তম ওভারের চতুর্থ বলে লোকি ফার্গুসনকে মিডউইকেট অঞ্চলে ঠেলে ২ রান নেন কোহলি। আটটি চার ও এক ছক্কায় ১০৬ বলে পৌঁছে যান ক্যারিয়ারের ৫০তম ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে। ২৭৯ ইনিংসে নতুন মাইলফলক গড়লেন ডানহাতি মহাতারকা। শচীন ৪৫২ ইনিংসে ৪৯ সেঞ্চুরি করে অবসরে গেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোহলির মোট সেঞ্চুরি হল ৮০টি, টেস্টে ২৯ ও টি-টুয়েন্টিতে একটি শতক আছে তার।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আজ শচীনের আরও দুটি রেকর্ড ভেঙেছেন কোহলি। ২৭তম ওভারের শেষ বলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৭২তম ফিফটি পূর্ণ করেছিলেন, ৫৯ বলে ফিফটি ছোঁয়া ইনিংসে সেসময় ছিল চারটি চারের মার। ফিফটি পূর্ণ করে সাকিব আল হাসান ও শচীন টেন্ডুলকারকে টপকে ওয়ানডে বিশ্বকাপের এক আসরে সবচেয়ে বেশি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসের মালিক হয়ে যান কোহলি।
আসরে এপর্যন্ত কোহলির পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংসের সংখ্যা ৮টি। যার মধ্যে রয়েছে তিনটি সেঞ্চুরি ও পাঁচটি ফিফটি। ২০০৩ বিশ্বকাপে ছয়টি ফিফটি ও এক সেঞ্চুরিতে সাতটি পঞ্চাশোর্ধ্ব রানের ইনিংস খেলেছিলেন শচীন। ২০১৯ বিশ্বকাপে পাঁচটি ফিফটি ও দুটি সেঞ্চুরিতে শচীনের পাশে নাম লেখান বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।
সেই রেকর্ডের কিছুপর শচীনের আরও একটি রেকর্ড ভেঙেছেন কোহলি, এক আসরে সর্বোচ্চ রানের মালিক হয়ে গেছেন ভারতের টপঅর্ডার ব্যাটার। বিশ্বকাপে এক আসরে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক এতদিন ছিলেন শচীন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ১১ ইনিংসে ছয় ফিফটি ও এক সেঞ্চুরিতে করেছিলেন ৬৭৩ রান। ২০ বছর পর শচীনের রেকর্ডটি ভাঙলেন কোহলি। ওয়াংখেড়েতে সেমিতে নামার আগে শচীন থেকে ৮০ রান দূরে ছিলেন। ৩৪ ওভারের চতুর্থ বলে ৮০ রানে পা দিয়ে শচীনকে ছাড়িয়ে যান। চলতি আসরে ১০ ইনিংসে কোহলির রান এপর্যন্ত ৭১১।
দর্শকদের অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী করে ৪৪তম ওভারের শেষ বলে ডিপ স্কয়ার লেগ অঞ্চলে ডেভন কনওয়ের হাতে ধরা পড়ে ফিরে যান কোহলি। ৯ চার ও এক ছক্কায় ১১৩ বলে ১১৭ রান করে টিম সাউদির শিকার হন।
আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ঝড়ো সূচনা উপহার দিয়েছিলেন রোহিত শর্মা ও শুভমন গিল। ৮ ওভার ২ বলে দুই ওপেনার তুলে নেন ৭১ রান। ২৯ বলে ৪ চার ও ৪ ছক্কায় ৪৭ রান করে রোহিত আউট হলে জুটি ভাঙে। টিম সাউদির স্লোয়ার ডেলিভারিতে উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিডঅফে কেন উইলিয়ামসনের তালুবন্দি হন।
আউট হওয়ার আগে অবশ্য রেকর্ড গড়েছেন রোহিতও। ক্যারিবিয়ান ব্যাটিংদানব ক্রিস গেইলকে টপকে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ছক্কা মারা ব্যাটার এখন ভারত দলপতি। বিশ্বকাপে তার ছক্কা হয়ে গেছে ৫১টি। গেইল ওয়ানডে বিশ্বকাপে মোট ৪৯ ছক্কা মেরেছিলেন। ম্যাচের পঞ্চম ওভারে বোল্টের বলে লং লেগের উপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে ৫০তম ছক্কাটি মেরে রেকর্ড গড়েন রোহিত। পরে ষষ্ঠ ওভারে মিচেল স্যান্টনারের বলেও ওভার বাউন্ডারি মারেন।
রোহিত ফেরার পর ব্যাটে আসেন কোহলি। ক্রিজে আসার পরই লেগ বিফোরের আবেদন করা হয় তার বিপক্ষে। কিউইরা রিভিউও নেয়। টিভি রিপ্লেতে দেখা যায় বল কোহলির ব্যাট ছুঁয়েছিল। রানের খাতা খোলার আগে তাই তাকে মাঠ ছাড়তে হয়নি। বাকিটা ইতিহাস হয়ে থাকল।
বিশ্বকাপে নিজের প্রথম সেঞ্চুরির পথে ছিলেন শুভমন গিল। তার মাঝে চোট পেয়েছেন ২৪ বর্ষী ব্যাটার। ২৩তম ওভারের চতুর্থ বলে লংঅন অঞ্চলে বল ঠেলে দিয়ে এক রান নেন কোহলি। রান নিতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়ে গিল রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে বাইরে যান। তখন আট চার ও তিন ছক্কায় ৬৫ বলে ৭৯ রানে ছিলেন। পরে নেমে ১ বল খেলে ১ রান যোগ করে ৬৬ বলে ৮০ রানে অপরাজিত থাকেন গিল।
ইনিংসজুড়ে কোহলি ও শ্রেয়াস আয়ারের ঝলকের দেখা মেলে। রেকর্ড গড়ে কোহলি ফেরার পর সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন আয়ার। ৪৭.২ ওভারে তিনটি চার ও আটটি ছক্কায় ৬৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। ৪৯তম ওভারে আয়ারও ফিরে যান। চারটি চার ও আট ছক্কায় ৭০ বলে ১০৫ রান করে।
শেষদিকে ঝলক দেখান লোকেশ রাহুল। ২০ বলে ৩৯ রান করে অপরাজিত থাকেন। ছিল পাঁচটি চার ও দুটি ছক্কার মার। ইনিংসের শেষ ওভারে সূর্যকুমার যাদব ফিরে যান ১ রান করে।
নিউজিল্যান্ডের হয়ে টিম সাউদি তিনটি উইকেট নেন। ট্রেন্ট বোল্ট নেন একটি উইকেট।







