এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
আব্দুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয় দীর্ঘদিন থেকেই প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু। স্বাধীনতার আগে এই স্থানটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহ আব্দুল গনি রোডের চার দেয়ালের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করে। যদিও শুরুতে এই ভবনগুলো সচিবালয় হিসেবে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়নি।
বর্তমানে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয়টিতে একসময় ইডেন কলেজ এবং স্কুল অবস্থিত ছিল। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সে সময় ইডেন ভবনের ১ নং বিল্ডিংটি কলেজ, ২ নং ভবনটি লাইব্রেরি, ৩ নং ভবনটি হোস্টেল এবং ৮ নং ভবনটি স্কুল ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যা ১৯৩৯ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল।
১৮৭৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় ব্রাহ্মণ মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ফরাশগঞ্জে প্রথম একটি স্কুল স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় আব্দুল গনি রোডের বর্তমানে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়।

প্রথমে এ স্কুলটি ঢাকা ফিমেল স্কুল নামে থাকলেও পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাজত্বকালে নিয়োজিত লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এসলে ইডেনের নামানুসারে ১৮৭৮ সালে স্কুলটির নামকরণ করা হয় ‘ইডেন স্কুল’। এ চারটি ভবন এখনো ‘ইডেন ভবন’ নামেই পরিচিত। জানা যায়, তিনি ছিলেন ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ বার্মার প্রথম নিযুক্ত বেসামরিক গভর্নর।
১৯৪৭ সালে (মতান্তরে ১৯৪৫ সালে) পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয় হিসেবে এই ইডেন ভবনগুলো ব্যবহার করা শুরু হয়। স্থান সংকুলানের জন্য ইডেন ভবনের পাশের খালি জায়গায় অতি অল্প সময়ে কিছু টিনশেড নির্মাণ করে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালু করা হয়।
সচিবালয় হিসেবে আলাদা কোনো নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল কিনা তা জানা না গেলেও কথিত আছে, পাকিস্তান আমলে সংসদ ভবন নির্মাণ পরিকল্পনার একটি অংশ হিসেবে সচিবালয় আগারগাঁও এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে নানাবিধ কারণে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, সর্বপ্রথম ব্রিটিশ সরকার এ অঞ্চলের প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্র হিসেবে ১৯০৪ সালে পূর্ব বাংলা ও আসামের প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয় হিসেবে বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাচীন ভবনটি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৯২১ সালে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কাজ শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত মেডিকেল সেন্টারটি আমেরিকান আর্মফোর্সের হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইন্টারনেট সূত্রে জানা যায়, সেখান থেকেই বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু এরপর আলাদা করে সচিবালয় স্থাপন করা হয়নি।
বর্তমানে সচিবালয়ের ১, ২, ৩ এবং ৮ নং ইডেন ভবনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর অবস্থিত। তবে ভবনগুলো সচিবালয় কার্যক্রমের জন্য নির্মিত না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি। সরকারি দপ্তরের প্রকৃতির সঙ্গে এসব ভবনের কাঠামোগত মিল নেই। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও শাখার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে স্থান সংকট ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করেছে।
২০১২ সালে আমি যখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে পদায়িত হই, তখন আমাকে শৃঙ্খলা ৫ শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের বিভাগীয় মামলার বিষয়সহ জটিল ও গোপনীয় দায়িত্ব ছিল এ শাখার এখতিয়ারে। আমার শাখা ছিল ২ নং ইডেন ভবনের ২ তলার কাঠের পাটাতনের কমন রুমে। সম্ভবত এটাই ইডেন কলেজের সেই লাইব্রেরি।
সে সময় ই-নথির কার্যক্রম শুরু হয়নি। হার্ড ফাইলে শাখার সব আবেদন নিষ্পন্ন করতে হতো। ফলে ২ নং ইডেন ভবনের ২ তলা থেকে ফাইল পাঠাতে হতো ৩ নং ইডেন ভবনের তিনতলায়, যেখানে শৃঙ্খলা অধিশাখার উপসচিব বসতেন।
শৃঙ্খলা অধিশাখার উপসচিব নথিটি অনুমোদনের পর ১ নং ইডেন ভবনের এক তলায় যুগ্ম সচিবের দপ্তরে, সেখান থেকে জনপ্রশাসন সচিব মহোদয়ের কক্ষে ১ নং ইডেন ভবনের তিনতলায় পাঠানো হতো। অর্থাৎ এক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি ফাইলকে তিনটি ভবন ঘুরতে হতো। এ ঘটনা ছিল প্রতিদিনের স্বাভাবিক বিষয়।
দেড় বছর এভাবে শৃঙ্খলা শাখায় কাজ করার পর আমাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পরিকল্পনা ৪ শাখায় পদায়ন করা হয়, পাশাপাশি উন্নয়ন শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা চার শাখাটি ছিল সচিবালয়ের উত্তর দিকে মসজিদের সামনে ২৪ নং টিনশেডে, যা ১৯৪৭ সালের পর তড়িঘড়ি করে সচিবালয় স্থানান্তর করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। উন্নয়ন শাখার জন্য তখন কোনো কক্ষ বরাদ্দ হয়নি। আমি ছাড়া আরো দুই জন সিনিয়র সহকারী সচিব সেই টিনশেডে বসতেন।
একইভাবে, এই টিনশেডগুলোতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, হিসাব রক্ষণ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসতেন এবং শাখাসমূহের নথি অনুমোদনের ক্ষেত্রে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো।
সচিবালয়ের ১ নং ইডেন ভবন হতে ৭ নং ভবন পর্যন্ত প্রতিটি ভবনেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অবস্থিত। অন্যন্য কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের অবস্থাও অনেকটা একই। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তৎকালীন সচিবালয় নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আলাপ করা শুরু করি। তাকে জানালাম, ২৩ ও ২৪ নং টিনশেড এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এক ভবনে আনা সম্ভব হবে কি না।
তিনি জানালেন, আগে এখানে একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সচিবালয়কে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থানান্তরের একটি পরিকল্পনা থাকায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। আমি সেই উদ্যোগের কোনো কাগজপত্র পেতে চাইলে, তিনি কিছু ফটোকপি সরবরাহ করেন।

“জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শাখাগুলোকে একত্রে আনতে ২৩ ও ২৪ নম্বর টিনশেড এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন। এটি ‘জনপ্রশাসন ভবন’ নামে নামকরণ করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক কাজের দক্ষতা ও গতিশীলতা বাড়বে এবং সম্পদের সাশ্রয় হবে- ইত্যাদি ।”
আমার উপস্থাপিত নথিটি অতিরিক্ত সচিব মহোদয় পর্যন্ত পৌঁছায়। তিনি “আলাপ করুন” লিখে নথি ফেরত পাঠান। তখন সমস্যা সমাধানে কারো আন্তরিকতার কোনো অভাব ছিল না, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেননি যে এটি বাস্তবে সম্ভব।
পরবর্তীতে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন মহলে এ ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে কর্তৃপক্ষ নথিটি তলব করেন। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলাপ শুরু হয়।
ইতিমধ্যে ২০১৫ সালে আমি পিএইচডি স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাই। তিন বছর পর ফিরে এসে দেখি ২৪ নম্বর টিনশেডের জায়গায় নতুন বিল্ডিং গড়ে উঠছে। একসময় যা অবাস্তব মনে হত, তা বাস্তবায়িত হয়েছে। ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন, সেই নথির উপর ভিত্তি করে ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর ৬ নং, ৯ নং ও ১১ নং ভবন ছাড়া নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ১৯৩৯ সালে নির্মিত ইডেন ভবনে অবস্থিত মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের স্থানান্তরের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইডেন ভবনসমূহ নির্মাণের প্রায় ৮৬ বছর পর এবং সচিবালয় হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ৭৮ বছর পর এই ভবনগুলোতে অবস্থিত কার্যালয়গুলো স্থানান্তরের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু উদ্যোগী কর্মকর্তা এই কাজটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তাদের প্রচেষ্টা না থাকলে এটি বাস্তবায়িত হতো না।
সুদীর্ঘ সময় পর ১, ২ ও ৩ নং ইডেন ভবনের স্থান সংকুলানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। এতে সচিবালয়ের কর্মপরিবেশ অনেক বেশি যুগোপযোগী হবে এবং জনসেবা দ্রুততার সাথে প্রদান করা যাবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








