চলতি বছরের জুন মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস জানিয়েছে, ২১ জুন মেরু অঞ্চল বাদে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ রেকর্ড করা হয়। এদিনের তাপমাত্রা ২০২৩ ও ২০২৪ সালের একই সময়ের আগের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে।
সংস্থাটির মতে, সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরন, জলবায়ু এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এটি এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও চরম আবহাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের জুনে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছালে বিজ্ঞানীরা পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক, ভয়াবহ এবং পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি বলে মন্তব্য করেছিলেন। তখনই এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপপ্রবাহ, বন্যা ও শক্তিশালী ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবারও দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে। গত মাসে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ তীব্র তাপপ্রবাহে নতুন রেকর্ড দেখেছে। একই সময়ে অ্যান্টার্কটিকায়ও স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক উষ্ণ শীত অনুভূত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণত স্থলভাগের তাপমাত্রা নিয়ে বেশি আলোচনা হলেও মহাসাগরের তাপমাত্রা পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। সূর্যের বিকিরণ, সমুদ্রস্রোত এবং গভীর সমুদ্রে তাপ সঞ্চয়ের মতো বিভিন্ন কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয়।
বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপশক্তির ৯০ শতাংশেরও বেশি শোষণ করে মহাসাগর। তেল, কয়লা ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারই এ উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। গত বছর মহাসাগরে সঞ্চিত অতিরিক্ত তাপের পরিমাণ রেকর্ড ২৩ জেটাজুলে পৌঁছায়, যা আগের দুই দশকের গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।
এ কারণে সমুদ্র দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সালে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় পাঁচটি হিরোশিমা বোমার বিস্ফোরণের সমপরিমাণ তাপ মহাসাগরে যুক্ত হচ্ছিল। গত বছর সেই হার বেড়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১টি হিরোশিমা বোমার শক্তির সমান তাপে পৌঁছেছে।
এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, মানবজাতি পৃথিবীকে তার সহনক্ষমতার সীমার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের বর্তমান উষ্ণতা সাময়িক নাকি দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ বছরের সর্বোচ্চ সমুদ্র তাপমাত্রা সাধারণত জুলাই ও আগস্ট মাসেই রেকর্ড করা হয়।
কোপারনিকাসের পরিচালক কার্লো বুওনটেম্পো বলেছেন, এটি জলবায়ুর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। সমুদ্রের তাপমাত্রা যদি এভাবেই উচ্চ অবস্থানে থাকে এবং এল নিনো আরও সক্রিয় হয়, তাহলে আগামী মাসগুলোতে নতুন নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড গড়ার আশঙ্কা রয়েছে।







