দীর্ঘদিনের আলোচনা শেষে ইউরেনিয়াম সরবরাহ সহজ করতে প্রশাসনিক চুক্তিতে সই করেছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। দুই দেশের ভাষ্য, এটি মূলত শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচির জন্য একটি বাস্তবায়নমূলক পদক্ষেপ। তবে, চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত ভারসাম্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আজ ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের শীর্ষ বৈঠকের পর এই সমঝোতা ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সাইবার নিরাপত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করারও ঘোষণা দিয়েছে দুই দেশ।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের ভারত-অস্ট্রেলিয়া বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির আওতায় শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ভারতে ইউরেনিয়াম রপ্তানির প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। এর ফলে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে জ্বালানি সরবরাহ আরও সহজ হবে এবং অস্ট্রেলিয়ার জন্য তৈরি হবে একটি বড় রপ্তানি বাজার।
কেন এখন এই চুক্তি?
ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। শিল্পায়ন, নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশটির বিদ্যুতের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত ইতিমধ্যে ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অন্যদিকে বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু দেশটি নিজে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। ফলে ইউরেনিয়াম রপ্তানি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

দুই দেশের নেতারা যা বলছেন
মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া-ভারত সিইও ফোরাম ও ইকোনমিক রোডম্যাপ বিজনেস রিসেপশন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপুল ইউরেনিয়াম মজুদ ভারতের পারমাণবিক যাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, অস্ট্রেলিয়া ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ইউরেনিয়াম সরবরাহকারী হতে প্রস্তুত। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার কৌশলগত অংশীদারত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তিতে কী রয়েছে?
ইউরেনিয়াম সরবরাহের পাশাপাশি দুই দেশ আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে,
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ও যৌথ বিনিয়োগ
- পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সবুজ হাইড্রোজেন
- প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি
- সাইবার নিরাপত্তা
- উন্নত প্রযুক্তি ও গবেষণা
- ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা
- সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা
এছাড়া সামুদ্রিক নজরদারি, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা উদ্ভাবনেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
ভারতের জন্য কী অর্থ বহন করছে?
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও কয়লাভিত্তিক। ইউরেনিয়ামের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো সহজ হবে। এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কার্বন নিঃসরণও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভারতের জ্বালানি সরবরাহের উৎস আরও বহুমুখী হবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার সময় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার লাভ কোথায়?
অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের মতো বড় বাজারে ইউরেনিয়াম রপ্তানি দেশটির খনিজ খাতকে নতুন গতি দেবে। পাশাপাশি ভারতীয় বাজারে অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যিক উপস্থিতিও আরও শক্তিশালী হবে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইতিমধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৪৪০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এই নতুন সহযোগিতা সেই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে পারে।

শুধু জ্বালানি নয়, কৌশলগত বার্তাও
এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া উভয়ই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরেনিয়াম চুক্তিকে শুধু বাণিজ্যিক নয়, বরং বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কোনো ঝুঁকি আছে কি?
চুক্তিটির কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। এছাড়া পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় বিষয়। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় ইউরেনিয়াম রপ্তানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। আশঙ্কা আছে, পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে ভারত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার তদারকির আওতায় অসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা করে এবং এই চুক্তিও সেই কাঠামোর মধ্যেই বাস্তবায়িত হবে।
ইউরেনিয়াম চুক্তি দুই দেশের সহযোগিতার কেবল একটি অংশ। ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা খাতেও সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। ফলে ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক এখন শুধু বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমীকরণেও এই অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।







