কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত স্মার্ট গ্লাস এখন শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন ধরনের ‘চিট কোড’ হয়ে উঠছে। চোখের পলকে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে গোপনে উত্তর পাওয়ার সুযোগ থাকায় চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরীক্ষায় নকলের নতুন এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে পরীক্ষা ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি ও নতুন নীতিমালা গ্রহণ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রোববার (২৮ জুন) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এআই-সক্ষম স্মার্ট গ্লাসের অপব্যবহারের বিষয়টি সামনে এনেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ইংরেজি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই পরীক্ষার্থী স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে নকলের সময় ধরা পড়েন। এটিই দেশটিতে এআই-সক্ষম চশমা ব্যবহার করে পরীক্ষায় নকলের প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা।
অন্যদিকে তাইওয়ানের একটি মেডিকেল স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থীও স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে ধরা পড়েন। পরীক্ষা পরিদর্শকেরা তার চোখের অস্বাভাবিক নড়াচড়া লক্ষ্য করার পর সন্দেহ করেন। পরে চশমাটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেটি থেকে তাপ নির্গত হচ্ছে, যা এর ভেতরে লুকানো প্রযুক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
এসব ঘটনার পর বিভিন্ন দেশে পরীক্ষার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
চীনের অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ কলেজ ভর্তি পরীক্ষা ‘গাওকাও’-এ, যেখানে প্রতিবছর এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়, সেখানে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের আগে পরীক্ষার্থীদের চশমা পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতীয় কলেজ ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থা এআই-সক্ষম স্মার্ট গ্লাস মোকাবিলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। যদিও দেশটির পরীক্ষা কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ডিভাইস আগে থেকেই নিষিদ্ধ।
তাইওয়ানের সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের পরীক্ষার নীতিমালা ও পরিচালনা পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক এআই স্মার্ট গ্লাস আগের পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। এগুলো আকারে ছোট, সহজে শনাক্ত করা যায় না এবং স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে উন্নত এআই মডেল ব্যবহার করতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তির জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়ছে। মেটা ২০২৩ সালে তাদের এআই-সক্ষম রে-ব্যান স্মার্ট গ্লাস বাজারে আনে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর এ ধরনের সাত মিলিয়নের বেশি চশমা বিক্রি হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ডিকিন ইউনিভার্সিটির প্রভাষক টমাস করবিন বলেন, ‘২০২২ সালে প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি যেমন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল, পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এআই স্মার্ট গ্লাস ঠিক তেমনই বড় চ্যালেঞ্জ।’
তার ভাষায়, ‘ভবিষ্যতে বর্তমান পদ্ধতিতে নির্ভরযোগ্যভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।’
এদিকে হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এইচকেইউএসটি) সহকারী অধ্যাপক মেং জিলি বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া একটি এআই স্মার্ট গ্লাস ব্যবহার করে স্নাতক পর্যায়ের একটি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার অনুকরণে গবেষণা চালান।
গবেষণায় দেখা যায়, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের দিকে তাকালেই স্মার্ট গ্লাসটি প্রশ্নগুলো একটি বৃহৎ ভাষা মডেলভিত্তিক এআইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এরপর এআই উত্তর তৈরি করে, যা সরাসরি চশমার লেন্সে প্রদর্শিত হয়।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, এআইয়ের সহায়তায় পাওয়া ফলাফল ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর একটি শ্রেণিতে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে স্থান করে নেয়। যেখানে ওই শ্রেণির গড় নম্বর ছিল ৭২।
মেং জিলি বলেন, ‘এই পরীক্ষা নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। এআই যখন এত কিছু করতে পারে, তখন শিক্ষার্থীদের কতটা মুখস্থ জ্ঞান প্রয়োজন এবং মূল্যায়নের সময় এআই ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া উচিত কি না, সেটি নতুন করে ভাবতে হবে।’
গবেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন পদ্ধতি নতুনভাবে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে।
এইচকেইউএসটির ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ঝাং জুন বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো, আমরা কত দ্রুত শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব। আমাদের শেখানোর পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ধরন নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।’
অন্যদিকে হংকং এডুকেশন ইউনিভার্সিটির এআই অ্যান্ড ডিজিটাল কম্পিটেন্স এডুকেশন সেন্টারের পরিচালক কং সিউ চেউং বলেন, এআইকে শুধু হুমকি হিসেবে দেখলে হবে না। বরং শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যুক্তিবোধ এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।







