বন্যায় থমকে আছে নেপালের পর্যটন, চরম বিপাকে লাখো মানুষ

নেপালের উত্তরাঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলেও এর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশটির পর্যটন খাতে। অক্টোবর-নভেম্বর জুড়ে ভরা পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও বিদেশি দর্শনার্থীদের দেখা নেই। এতে পর্যটনের নির্ভর প্রায় ১০ লাখ মানুষ কঠিন বিপাকে পড়েছেন।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর পর্যটন ব্যবসায়ী পুষ্পরাজ রিমাল। তিনি পেশায় একজন ট্যাক্সিচালকও। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। এ সময় পর্যটক বাড়ে এবং ব্যবসাও বেশ জমে ওঠে।
তবে এবার তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। গত মাসের প্রলয়ংকরী বন্যায় দেশটিতে ১ হাজার ৪৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মূল মহাসড়কগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জেরে অনেক পর্যটক তাদের বুকিং বাতিল করেছেন।
৪২ বছর বয়সী পুষ্পরাজ জানান, পরিস্থিতি এখনও অনেকটা লকডাউনের মতো। তিনি কাঠমান্ডু এবং পোখারার বিভিন্ন হোটেল ও ট্রেকিং কোম্পানির হয়ে কমিশনে কাজ করেন। নেপালি ও হিন্দি ভাষায় দক্ষ এই ব্যবসায়ী এখন দিশেহারা।
আগস্ট মাসে বর্ষাকাল বিদায় নেয়। এরপর আকাশ পরিষ্কার হলে নেপালে পর্যটনের মূল মৌসুম শুরু হয়। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে।
গত বছর ১১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি পর্যটক নেপাল ভ্রমণ করেছিলেন। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ এসেছিলেন সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে।
উত্তরাঞ্চলে নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহ ধসে এবারের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বন্যা মুক্ত এলাকাগুলোতেও। আতঙ্কিত পর্যটকরা নিরাপদ অঞ্চলগুলোতেও যেতে চাইছেন না।
পুষ্পরাজ দুই মাসের জন্য দুটি গাড়ি ভাড়া করেছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক সময়ের চার ভাগের এক ভাগ ব্যবসাও তিনি করতে পারেননি। বেশিরভাগ পর্যটক বুকিং বাতিল করেছেন। ফলে হোটেল বা আয়োজকদের কাছ থেকে তিনি কোনো কমিশন পাচ্ছেন না।
সামনে হিন্দুদের বড় উৎসব দশৈঁ। পুষ্পরাজ তার দুই সন্তান হেমা এবং রাহুলকে একটি করে ট্যাব কিনে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন। আয় না থাকায় জীবনে প্রথমবারের মতো সন্তানদের দেওয়া কথা তাকে ভাঙতে হচ্ছে।
একই অবস্থা কাঠমান্ডু থেকে পোখারা ও চিতোয়ানগামী মহাসড়কের বিক্রেতাদের। ৬১ বছর বয়সী সীতা নেপালি ও তার স্বামী রামাকান্ত মহাসড়কের পাশে ঘরে তৈরি ঘোল বিক্রি করেন। তারা এলাকায় পনিরও বিক্রি করেন। এর আয়েই তাদের সংসার চলে।
সীতা জানান, তাদের এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়নি। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় তারা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রাস্তা বন্ধ থাকায় বন্যার পর টানা ১১ দিন তাদের কোনো আয় হয়নি।
রাস্তা খোলার পর শুরুতে শুধু সরকারি গাড়ি চলাচলের অনুমতি ছিল। এখন কিছু পর্যটক আসলেও বিক্রি আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
নেপাল নিরাপদ, দাবি সংশ্লিষ্টদের
যুক্তরাজ্যের নাগরিক অ্যালেক্সা পাঁচ বন্ধুকে নিয়ে পোখারা ও ধুলিখেল ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। তারা জুলাই মাসেই কাঠমান্ডু বিমানবন্দর থেকে পোখারা যাওয়ার গাড়ি এবং হোটেল বুক করে রেখেছিলেন। কিন্তু ২৬ আগস্ট বন্যার খবর পেয়ে তারা পুরো যাত্রা বাতিল করেন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক জাপানি পর্যটকও তার ভ্রমণ বাতিলের কথা জানান। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাটের চেয়ে চারপাশের পরিবেশ তাকে বেশি ভাবিয়েছে। আটকে পড়া মৃতদেহগুলো তার পরিবারের জন্য ভীতিকর হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে ভারতের তাপস কুমার সম্পূর্ণ যাত্রা বাতিল করেননি। তিনি পোখারা যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন। এর বদলে কাঠমান্ডুতে থাকার সময় সাত দিন পর্যন্ত বাড়িয়েছেন।
বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই নিজ দেশের দূতাবাসের ভ্রমণ সতর্কতা নজরে রাখছেন। ভারতীয় দূতাবাসের শার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স সুরেন্দ্র থাপা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। তিনি বলেন, অনেকেই ভ্রমণ সতর্কতা নিয়ে ভুল বুঝেছেন। নেপাল পর্যটকদের জন্য নিরাপদ। শুধু নির্দিষ্ট কিছু এলাকা এড়িয়ে চলা উচিত।
অন্যদিকে ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য একটি সতর্কতা জারি করে। দেশটির দূতাবাস জানায়, বন্যার কারণে নেপালের অনেক এলাকা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। সেখানে নিরাপদ ভ্রমণের নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। মার্কিন দূতাবাসও নেপালের বেশ কিছু এলাকাকে অনিরাপদ ঘোষণা করেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের কঠিন সময়
প্রমিলা ছেত্রী চিতোয়ানের একটি রিসোর্টে কাজ করেন। সেপ্টেম্বরের জন্য তার রিসোর্টের সব কক্ষ আগে থেকেই ভাড়া হয়ে ছিল। এজন্য বিশেষ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং ভালো মানের জিনিসপত্র কেনা হয়েছিল। কিন্তু ২৩ দিন পার হলেও তারা এখন বড় লোকসানের মুখে।
প্রমিলা জানান, বন্যার সতর্কবার্তাকে অনেকেই পুরো দেশের জন্য ভেবে ভুল করছেন। এর ফলে ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। বন্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের রিসোর্টের ৮০ শতাংশ বুকিং বাতিল হয়ে যায়। কারণ চিতোয়ান যাওয়ার মূল মহাসড়কটি প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল।
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একটি দলের আসার কথা ছিল। তারা যাত্রা বাতিল না করে অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। তাই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এখন সেই বুকিংয়ের দিকে চেয়ে আছে।
পর্যটনে ধসের পুরো অর্থনৈতিক প্রভাব এখনও নিরূপণ করা যায়নি। তবে পুষ্পরাজ ও সীতার মতো ছোট ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে খাদের কিনারে চলে গেছেন।
সীতা আবার সড়কের পাশে ঘোল নিয়ে বসছেন। কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম। আয় কমে যাওয়ায় দুপুরের খাবারে শুধু চিড়া ও ঘোল খাচ্ছেন তারা। পর্যাপ্ত সবজি কেনার সামর্থ্যও এখন নেই। প্রতিদিন পর্যটকের আশায় সড়কের পাশে বসেন সীতা। সুন্দর নেপাল দেখতে আসা পর্যটকেরা আবার তাদের পণ্য কিনবেন, সেই অপেক্ষাতেই দিন কাটছে তার।






