সরকার সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যদিয়ে অসহায় ও পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠির সার্বিক প্রয়োজন অনুসারে বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যাতে সমাজে পরস্পর সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেট (২০২৪-২০২৫) বরাদ্দের তুলনায় দারিদ্র্য হ্রাসের অন্যতম পন্থা হিসাবে স্বীকৃত সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় বরাদ্দ বাড়েনি। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে ‘দারিদ্র্যবিমোচন ত্বরান্বিত করার’ সরকারি লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। ভাতাভোগীদের মাথাপিছু বরাদ্দকৃত অর্থ তাদের জীবনধারণের নূন্যতম উপকরণের চাহিদা মেটাতে সমর্থ না হওয়ায় তারা ‘দারিদ্র্য মুক্ত’ হতে পারছে না। জীবনমানের উন্নতি না হওয়ায় তাদের শ্রেণিগত পরিবর্তনও হচ্ছে না। অর্থাৎ তারা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে, যার সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি। অথচ সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় রয়েছেন মোট দাবিদারের মাত্র ২৫ শতাংশেরও কম আর এর ৭৫ শতাংশেরও বেশি দরিদ্র মানুষ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। নানামুখী কৃত্রিম বাধার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটাই যোগ্য সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছায় না। এতে সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছে সুবিধাপ্রদানকারীরা। তাই জাতীয় স্বার্থেই সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের যথার্থ জবাবদিহিতা দরকার। সুতরাং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের কর্মসূচিতে এমনভাবে ভাতাভোগীর সংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দ নির্ধারণ করতে হবে, যাতে একসময় ভাতাভোগীদের শ্রেণিগত অবস্থার উত্তরণ ঘটে।
সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা আধুনিক জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ হলেও, প্রাচীন আমলেও এর প্রচলন ছিল। যেমন প্রাচীন মিসর-গ্রিস-রোম-চিন ও ভারতে এর দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু ইংল্যান্ড নিজ সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া দরিদ্র মানুষের সহায়তার জন্য ১৫৩১ ও ১৬০১ সালে দরিদ্র আইন প্রণয়ন করেন। ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত শিল্পবিপ্লবের পর দেশে দেশে সামাজিক সুরক্ষার চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। জার্মানির চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক ১৮৮৩ সালে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির কথা বিবেচনা করেছিলেন এবং ১৯১৭ সালে বলশেভিক তথা রুশ বিপ্লবের পর সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ১৯৩৫ সালে সামাজিক নিরাপত্তা আইন তৈরি করেন।
এছাড়া ১৯৪২ সালে যুক্তরাজ্যে লর্ড উইলিয়াম বিভারেজ কর্তৃক প্রণীত রিপোর্টের ভিত্তিতে সামাজিক নিরাপত্তা আইন ও কর্মসূচি রচিত হয়। তার বর্ণনায় সামাজিক নিরাপত্তা হচ্ছে: : ‘A job when you can earn and an income when you cannot.’ বর্তমান বিশ্বে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিভিন্ন বিমা ও সাহায্যভাতার প্রচলন দেখা যায়। অসুস্থতা-বেকারত্ব-দুর্ঘটনা ও অক্ষমতা ইত্যাদির জন্য সামাজিক বিমা এবং মাতৃত্ব-সিনিয়র সিটিজেন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির জন্য আপৎকালীন সামাজিক সাহায্য দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সংবিধানেও সামাজিক নিরাপত্তা মানবাধিকার হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সংবিধানে (পঞ্চদশ সংশোধন ২০১১ অনুচ্ছেদ ১৫-ঘ মৌলিক প্রয়োজন ব্যবস্থা) সামাজিক নিরাপত্তার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার।’ মৌল-মানবিক চাহিদা যাদের অপূরিত থাকে, যারা বিপর্যয় রোধ করতে পারে না অর্থাৎ দরিদ্র-বেকার-অসুস্থ-প্রতিবন্ধী-বিধবা-এতিম-পঙ্গু-ভিক্ষুক-ভবঘুরে-নির্ভরশীল বয়স্ক-পরিত্যক্ত মহিলা ও শিশুরা এ নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় পড়বে। এদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ভাগ করে যারা কর্মক্ষম তাদের সাধ্যানুযায়ী কাজ দেওয়া এবং যারা কাজ করতে জানে না তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া ও যারা কাজ করতে অক্ষম তাদের আর্থিক অথবা বিভিন্ন বস্তুগত সাহায্য প্রদান করা।
সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উপকারভোগী নির্বাচন। উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা। তারা দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির ইত্যাদি চিন্তা মাথায় রেখে তালিকা প্রণয়ন করে। এতে উপযুক্ত অনেক দরিদ্র মানুষই তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়ায় কর্মসূচির সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত হন। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের দরিদ্রাবস্থা যুগ যুগ ধরে থেকে যাবে। ২০০৫ সালে পরিকল্পনা কমিশন কর্তৃক প্রণীত দারিদ্র্যবিমোচন কৌশলপত্রে (পিআরএসপি) ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনাসহ জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তাবেষ্টনীতে নগদ অর্থপ্রদান, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বকর্মসংস্থানে ক্ষুদ্রঋণ, গরিব/অতি গরিব ব্যক্তি, গরিব/অতি গরিব বিধবা/স্বামী নিগৃহীতা মহিলা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধী ছাত্রছাত্রী, গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র গর্ভবতী মা, শহর অঞ্চলে কম আয়ের কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার, এতিম শিশু, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, চা-শ্রমিক, ক্যানসার-কিডনি-লিভার সিরোসিস-স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগী ইত্যাদির উল্লেখ ছিল। অথচ পিআরএসপি বাস্তবায়ন হওয়ার পরেও একাধিক কারণে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কাঙ্খিত সাফল্য বয়ে আনতে পারেনি। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার কারণ সঠিক পরিকল্পনা অভাব ও অর্থ বরাদ্দের স্বল্পতাসহ যথার্থ জবাবদিহিতা আর অব্যবস্থাপনা।
ফলে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন শ্রেণির সাহায্যপ্রার্থীদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, “রংপুর অঞ্চলে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশে। দারিদ্র্যের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ময়মনসিংহ অঞ্চলের দারিদ্র্য হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা রাজশাহী জেলার দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে খুলনা অঞ্চল চতুর্থ অবস্থানে।” তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে নিশ্চিতকরনে দরকার যথার্থ পরিকল্পনা ও বরাদ্দকৃত অর্থ প্রকৃত দরিদ্রের মধ্যে সঠিকভাবে বন্টনসহ কর্মসূচির কর্মকাণ্ডে দলীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রাখা।
দারিদ্র্য নিরসনে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বরং স্বল্প সময়ের জন্য এ কর্মসূচি চালু থাকতে পারে। ওএমএস ও ভিজিডি ইত্যাদির মাধ্যমে যেটা প্রচলিত রয়েছে তা বিচ্ছিন্ন এবং সাময়িক। এগুলো সামাজিক নিরাপত্তার সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না। বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র একটি দেশে যেখানে দুই কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্র, সেখানে তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা না হলে এ সাহায্যপ্রার্থীদের সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়বে। তাই দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থেইÑ সরকার ও নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো দল-মত এবং ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যমতেরভিত্তিতে একটি দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি প্রণয়ন করা একান্ত নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








