দায়মুক্তি কী? জুলাই অভ্যুত্থানে দায়মুক্তি কেন দরকার? কীভাবে এই দায়মুক্তি দেওয়া হবে? দেশে-বিদেশে এরকম দায়মুক্তির নজির কী আছে? থাকলে কীরকম? কীভাবে দেওয়া হয় দায়মুক্তি? এসব বিষয়েই আলোচনা করব এখন।
এরইমধ্যে হয়ত আপনি জেনেছেন, শেখ হাসিনা সরকার পতন আন্দোলনের সম্মুখসারিতে থাকা জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিতে একটি অধ্যাদেশ করছে সরকার। দায়মুক্তি অধ্যাদেশের একটি খসড়াও তৈরি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। উপদেষ্টা পরিষদের আগামী বৈঠকে এটা অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে বৃহস্পতিবার বিকেলে ফেসবুকের ভেরিফাইড পেইজে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা ডক্টর আসিফ নজরুল।
জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি শিরোনামে পোস্টে আসিফ নজরুল লেখেন, জুলাই যোদ্ধারা জীবনবাজি রেখে দেশকে ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে মুক্ত করেছিল। অবশ্যই তাদের দায়মুক্তির অধিকার রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার খুনিদের বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম করেছিল সে জন্য তাদের দায়মুক্তি দিয়ে আইন প্রণয়নের প্রয়োজনও রয়েছে। এ ধরনের আইন প্রণয়ন সম্পূর্ণ বৈধ বলে তার পোস্টে উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল।
বিষয়টির সমর্থনে মিশর এবং তিউনিশিয়ায় সংগঠিত আরব বসন্ত বা সমসাময়িককালের বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনধিকৃত সরকারগুলোর পতনের পর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দায়মুক্তির আইন হয়েছে বলে জানান তিনি। এমনকি বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে দায়মুক্তির আইনের বৈধতা রয়েছে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দায়মুক্তি আইন হয়েছিল বলে লিখেছেন আইন উপদেষ্টা।
তার পোস্টের শেষ লাইনটা যথেষ্ট শক্তিশালী। তিনি বলেছেন, জুলাইকে নিরাপদ রাখা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।
এই অধ্যাদেশ উদ্যোগের আগে অবশ্য জুলাই বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার না করতে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর একটি বিবৃতি দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তখন বলা হয়েছিল, গণ-অভ্যুত্থানকে সফল করতে যেসব ছাত্র-জনতা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনের মাঠে থেকে এর পক্ষে কাজ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংগঠিত গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ঘটনার জন্য কোন মামলা, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা যাবে না।
জুলাই ঘোষণাপত্রেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সকল শহীদকে জাতীয় বীর হিসেবে ঘোষণা করে শহীদদের পরিবার, আহত যোদ্ধা এবং আন্দোলনকারী ছাত্র–জনতাকে প্রয়োজনীয় সকল আইনি সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’
৪ জানুয়ারি রোববার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্থাপিত ৩ দফা দাবীর অন্যতম ছিল, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-শ্রমিক-জনতাকে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকান্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দিতে অধ্যাদেশ করার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করতে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয় ঐ বৈঠকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। যে দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি ও আইনি সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে তা হলো ২৫ ডিসেম্বর জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ৩ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করা। অবশ্য গ্রেপ্তারের এক দিন পর মাহদী এবং ১১ দিন পর সুরভী জামিন পান। তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে নিয়েও ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে আইন উপদেষ্টা লিখেছিলেন, সুরভীর বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ সে দ্রুত প্রতিকার পাবে।”
একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশে এর আগেও একাধিকার দায়মুক্তি দেওয়ার নজির রয়েছে। স্বাধীনতার পর ১ম বারের মত দায়মুক্তি দেওয়ার বিধানটি করা হয় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিতে। ১৯৭৩ সালের ২৮ ফ্রেব্রুয়ারি এক সরকারি অধ্যাদেশ জারি করে মুক্তিযুদ্ধকালের সব কর্মকান্ড, ঘটনাবলি এবং যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিশেষদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। ২য় দফায় ১৯৭৪ সালের মে মাসে দায়মুক্তি পায় রক্ষীবাহিনী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার খুন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি খন্দার মুশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের ইতিহাসে ৩য় বারের মতো দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারী করেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪দলীয় জোটের শাসনামলে পরিচালিত অপারেশন ক্লিন হার্ট এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়। ২১ বছর পর ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা দ্রুত বিদ্যুৎ জ্বালানি সরবরাহ আইন করে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দেন। আইন করে দায়মুক্তির এ ঘটনাটি ছিল ৫ম বারের মতো।
স্বাধীনতার পর ১ম দায়মুক্তি অধ্যাদেশে কী ছিল তাও একটু বলে যাই। ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ ন্যাশনাল লিবারেশন স্ট্রাগল (ইনডেমনিটি) অর্ডারে বলা হয়, এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ তারিখ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে। খুবই সংক্ষিপ্ত ঐ অধ্যাদেশটিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে অথবা ১৯৭২ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত কোনো কার্যের জন্য বা তৎসংশ্লিষ্ট কারণে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো মামলা, অভিযোগ বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম দায়ের বা পরিচালিত হবে না।
এতে আরো বলা হয় যে, উপরে উল্লিখিত সময়ে কারো বিরুদ্ধে যদি কোন মামলা হয়ে থাকে তবে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে সরকারি আইনজীবি আদালতে আবেদন করবেন এবং উক্ত আবেদন দাখিলের পর আদালতে মামলাটি আর অগ্রসর হবে না এবং উক্ত মামলা প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অবিলম্বে অব্যাহতি প্রদান করা হবে। এই আদেশের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের দায়মুক্তিও সেই পথ ধরেই আসছে। শুরু থেকেই এই দাবি ছিল ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান সংগঠকদের।








