ভালোবাসার বিকাশে, চ্যানেল আই আটাশে

একুশ বছর আগে। সন তারিখের হিসাবে ২০০৫ সাল। মাসের হিসাবে জুলাই। এমিরেটস এর একটি বিমান তখন রানওয়ে থেকে অনেক উপরে। দুবাইয়ের পথে। উচ্চতার হিসাবে পনেরো হাজার ফিট। জানালায় চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে পেঁজা তুলো মেঘ। সিট বেল্ট তখন রিলাক্স মুডে। আড্ডা চলছে কুমার বিশ্বজিৎ, এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে।
হঠাৎ মোবাইলে ক্ষুদেবার্তা সাগর ভাইয়ের। তিনি কথা বলতে চান। বলছি, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের কথা। কাছে ভিড়তেই বললেন, একটি দারুণ আইডিয়া আছে। দৈনিক প্রকাশিত পত্রিকা তো পাঠক হাতে পায় সকালে। কেমন হবে যদি রাত বারোটায় প্রকাশিত পত্রিকা নিয়ে তরতাজা একটি অনুষ্ঠান করা যায়। আমিও এই প্রস্তাবে একমত পোষণ করলাম। যেমন কথা তেমন কাজ। ঢাকায় ফিরেই শুরু হলো তোড়জোড়।
থামতি নেই। কমতি নেই। অবসাদ বা ক্লান্তির ফুরসত নেই। অন্তহীন এক উদ্দীপনা নিয়ে ছুটোছুটি। চটজলদি এক দুপুরে ফরিদুর রেজা সাগর ও চ্যানেল আইয়ের অন্যতম কর্ণধার শাইখ সিরাজ আমাকে নিয়ে বসলেন আলোচনার টেবিলে। আর তার রিফ্লেকশন সহসাই দেখা গেল চ্যানেল আই নামক চারকোণা জাদুর বাক্সোতে। ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট রাত বারোটায় শুরু হলো রাত-জাগানিয়া সেই ব্রেকিং অনুষ্ঠান। যার জন্ম হয়েছে বিমানে বসে। পত্রিকা নিয়ে তরতাজা টাটকা আয়োজন ‘আজকের সংবাদপত্র’। পাঠককে আর সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা নয়। তারাই দর্শকের ভূমিকায় চোখ রাখতে শুরু করে টিভি পর্দায় রাত ঠিক বারোটায়।
একটা সময় যেখানে বিটিভি এ সময় জাতীয় সংগীতের সুর মূর্ছনায় ইতি টানতো টিভি পর্দার, ঠিক সেখানে চ্যানেল আই জন্ম দেয় টিভি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত চাঙ্কের। চ্যানেল আইয়ের এমন আইস ব্রেকিং অনেক দর্শকনন্দিত অনুষ্ঠান জায়গা করে নিয়েছে দর্শক-হৃদয়ে। মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন, হৃদয়ে মাটি ও মানুষ, তৃতীয় মাত্রা, প্রকৃতি ও জীবন, গান দিয়ে শুরু, সেরা কণ্ঠ, খুদে গানরাজ, লাক্স-চ্যানেল আই সুপার স্টার, হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ, হুমায়ূন মেলা, রবীন্দ্র মেলা, নজরুল মেলা, প্রকৃতি মেলা, পার্বত্য লোকজ মেলা, চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, বীচ ফুটবল, আই স্পোর্টস, কৃষকের ঈদ-আনন্দ এমন অভিনব আয়োজনের শেষ নেই।
ঢাকায় বিটিভি’র সূচনা হয় ১৯৬৪ সালে। কিন্তু এদেশে টেলিভিশনের ইতিহাস যখন পঁয়ত্রিশের, ঠিক তখন ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর পথচলা শুরু করে ‘চ্যানেল আই’। স্লোগানেও নতুনত্ব, লোগোতেও অভিনবত্ব, সবকিছুই দেশাত্মবোধে পূর্ণ। চ্যানেল আইয়ের স্লোগান, ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’। বজ্রকঠিন দৃঢ় প্রত্যয় তাদের উচ্চারণে। লোগোতে লাল-সবুজ। হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ আর লাখো শহীদের দৃপ্ত শপথ।
সিদ্ধেশ্বরীর সেই ছোট্ট স্টুডিও। তা ছিল রীতিমতো রান্নাঘর। যেখানে ডালের সম্ভারের মউ মউ গন্ধে সকলেই দিনরাত মগ্ন থাকতেন সৃষ্টির আনন্দে। ছিল না তাতে কোনো দীনতা। প্রতিদিন নতুন নতুন আয়োজনের মাধ্যমে তারা দিয়ে গেছেন বারতা। একেক বছর একেকটি চমক দিয়ে চ্যানেল আই এগিয়ে গেছে। নানান বৈরী হাওয়া আর উতল পরিস্থিতিতেও সে মাথা নত করেনি, নিজের স্লোগানকে বুকে ধারণ করে জায়গা করে নিয়েছে। এক এক করে আজ চ্যানেল আই কৈশোর তারুণ্য পেরিয়ে পরিপক্ব টগবগে যৌবনে। টেলিভিশনের ইতিহাসে চ্যানেল আইয়ের অসংখ্য আয়োজন দর্শকের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। ইতিহাস গড়েছে। ব্যতিক্রমি যত আয়োজন বিশ্বজুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু সঙ্কট বর্তমানে চরমে। টালমাটাল এই পরিস্থিতিতে চ্যানেল আই আয়োজন করে চলেছে পরিবেশ সচেতনার নানান অনুষ্ঠান। ছাদ কৃষি ও ফিরে চল মাটির টানে। শহরে জমি কমছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু নতুন নতুন চিন্তার বিকাশে মানুষ কৃষি গড়ে তুলেছে তার ছাদে। একসময় প্রায় সকলেরই শৈশব মানেই গাঁয়ের মেঠো পথ আর নদী নালা। কিন্তু বর্তমানে সেই ছবিটিরও বদল ঘটেছে। শহরের শিক্ষার্থীদের কৃষির প্রতি দরদ তৈরিতে চ্যানেল আইয়ের অনন্য আয়োজন ফিরে চল মাটির টানে। কৃষকের সাফল্যগাঁথা তুলে ধরতে কৃষককে রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে রয়েছে ‘কৃষি বাজেট, কৃষকের বাজেট’-এর মতো ব্যতিক্রমি আয়োজন।
প্রকৃতির প্রতি মায়াঘেরা জগত তৈরিতে ব্যতিক্রমি আয়োজন প্রকৃতি ও জীবন। যে অনুষ্ঠানে প্রকৃতির প্রতি বিরূপ আচরণের ফলে আজকের যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণ পরিস্থিতি তা থেকে উত্তরণে করণীয় তুলে ধরা হয়।
এই বাংলার জনপদ রাজনীতি সম্পৃক্ত। গ্রাম বাংলার চায়ের আড্ডায় বরাবরই ঠাঁই করে নিয়েছে গণমানুষের বাতচিৎ। অধিকার সচেতন মানুষ যখন দশকের পর দশক সংসদ থেকে বঞ্চিত তখন চ্যানেল আই নিয়ে আসে ‘তৃতীয় মাত্রা’। এ যেনো বিকল্প সংসদ। এর বাইরে টু দ্য পয়েন্ট, স্ট্রেইট কাট এমন নানা অয়োজনের মাধ্যমে জবাবদিহিতা চর্চায় কাজ করছে টেলিভিশনটি।
দেশের সঙ্গীত প্রতিভার অন্বেষণের কথা উঠলেই আসে চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ আয়োজনের কথা। দেশজুড়ে অগুণতি গুণী শিল্পীদের খুঁজতেই এই আসর। যেখানে এক মঞ্চে দেশসেরা শিল্পী থেকে শুরু করে একেবারে উদীয়মান তরুণ শিল্পীরা কণ্ঠ মেলান, সৃষ্টি হয় সুরের ঐকতান। এখানেই শেষ নয় সঙ্গীতের অসাধারণ এক আয়োজন ক্ষুদে গানরাজ। সঙ্গীতের শুদ্ধধারা ও উৎকর্ষের বিকাশে চ্যানেল আইয়ের নিয়মিত আয়োজন ‘গান দিয়ে শুরু’। ইতিমধ্যেই প্রভাতের এই আয়োজন সাড়া ফেলেছে সর্বত্র।
বাঙালির গৌরবগাঁথা আর অহঙ্কারের প্রধানতম অলঙ্কার ভাষা আন্দোলন। মায়ের ভাষার জন্য যে জাতি জীবন দিয়েছে, সেই অবদানকে স্মরণীয় করতে চ্যানেল আই নতুনত্বের অভিযাত্রায় নির্মাণ করেছে ‘বাংলাবিদ’। সারাদেশের শিশু কিশোরদের মধ্যে বাংলাভাষার জাগরণে নির্মিত এই অনুষ্ঠান।
বর্তমান দুনিয়া তথ্য প্রযুক্তির। প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর সব আবিষ্কার বদলে দিচ্ছে মুহূর্তেই সবকিছু। চ্যানেল আইও পিছিয়ে নেই বিজ্ঞানের এই রিলেরেসে। ‘এসো রোবট বানাই’ তেমনি এক রিয়েলিটি শো। রোবট তৈরিতে দেশের মেধাবী তরুণদের উৎসাহ দিতেই এই আয়োজন।
বাঙালির নানান হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে বরাবরই পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে চ্যানেল আই। তারই ধারাবাহিকতায় চ্যানেল আই বিশেষ দিনগুলোতে আয়োজন করে আসছে নানা ধরনের মেলার।
মানুষের প্রত্যাশার পারদ ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ স্লোগান বুকে ধারণ করে চ্যানেল আই এগিয়ে চলেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে চ্যানেল আই মননশীল ও উন্নত জাতি গঠনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। আর এই দুর্গমগিরি পাড়ি দিতে গিয়ে কখনও ভুল হয়নি তা তো নয়। তবে সেই সব ভুল ত্রুটি উতরে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অবিচল থেকেছে দেশ মাতৃকার সমৃদ্ধি ও কল্যাণের পথে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শক শ্রোতার প্রত্যাশার পারদও হয়েছে ঊর্ধ্বমুখি। একটি দলনিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ ও সংবাদের নেপথ্যের চমকপ্রদ সব তথ্যে ঠাঁসা থাকবে চ্যানেল আই এমনটাই প্রত্যাশা ছয়টি মহাদেশের অগণিত দর্শক-শ্রোতার।
গণ-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেছে আজ গণমাধ্যম। গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ। মানুষ যখন দেখে টেলিভিশন তার জীবনকে সহজ করে দিচ্ছে, টেলিভিশন তাকে আত্মবিশ্বাসী করছে, টেলিভিশন তাকে স্বপ্নবান করছে তখনই মানুষ টেলিভিশনের প্রতি ঝুঁকতে থাকে। গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের এই আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি করতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে চ্যানেল আই। বিশ্বময় বাংলা ভাষাভাষীর স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষা আর জীবনধারার প্রিয় সঙ্গী চ্যানেল আই পথচলার সাতাশ পার করে আটাশে পা দিয়েছে। পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জ বুকে ধারণ করে চ্যানেল আই এবার আওয়াজ রেখেছে, সত্য সুন্দর প্রকাশে চ্যানেল আই আটাশে। জয়তু চ্যানেল আই।






