রাজধানীর উত্তরার তুরাগ এলাকায় ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের বুথে পৌঁছে দেওয়ার পথে মানি প্ল্যান্ট লিংক প্রাইভেট লিমিটেডের টাকা ডাকাতির পরিকল্পনা হয় এক বছর আগে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকার একটি চায়ের দোকানে।
ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের সোয়া ১১ কোটি ছিনতাইয়ের তিন মূল পরিকল্পনাকারীর একজন মো. আকাশ আহমেদ। উত্তরায় চায়ের দোকানে বসে ডাচ বাংলা ব্যাংকের টাকা বহনকারী মানি প্ল্যান্ট লিংক প্রাইভেট লিমিটেডের সাবেক চালক সোহেল রানার সঙ্গে পরিচয়। সোহেল রানাই আকাশকে মানি প্ল্যান্টের গাড়ি থেকে টাকা ডাকাতির পরিকল্পনা কৌশলের কথা জানান। তিনি জানতেন মানি প্ল্যান্টের কোন গাড়ি লক্করঝক্কর, কোন গাড়িতে কোনো গানম্যান থাকেন না।
১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১২ জনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে আট কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ডাকাতির ২০ লাখ টাকায় কেনা একটি গাড়িও।
পুলিশ জানিয়েছে এখনো পলাতক তিন ডাকাত। উদ্ধার করা যায়নি প্রায় তিন কোটি টাকা। বাকি আসামি ও টাকা উদ্ধারের পর চাঞ্চল্যকর মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
টাকা ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী কারা
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের সোয়া ১১ কোটি ছিনতাইয়ের মূল পরিকল্পনাকারী মো. আকাশ আহমেদ, মানি প্ল্যান্টের সাবেক ড্রাইভার সোহেল রানা ও হাবিবুর রহমান হাবিব। আকাশের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরে। ডিবি পুলিশের ছদ্মবেশে ডাকাতি করা তার পেশা। বনানীর একটি স্পা সেন্টারে যাতায়াত ছিল আকাশের। সেই সুবাদে পরিচয় হয় দালাল ইমন ওরফে মিলনের সঙ্গে। ডাকাতির পরিকল্পনা শুনে লোক সংগ্রহসহ সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
মানি প্ল্যান্টের চাকরিচ্যুত চালক সোহেল রানার বাড়ি বরিশালের গৌরনদী উপজেলায়। তিনি ও তার স্ত্রী একটি হত্যা মামলার আসামি। হাবিবুর রহমান হাবিব পেশায় গাড়ি চালক। গুলশানের একটি বাসায় চালক হিসেবে চাকরিরত অবস্থায় একজন গৃহকর্মী খুনে মামলায় তিনি ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি। আট বছর জেল খেটে বেরিয়ে তিনি আকাশের কথায় আবারও ডাকাতির কাজে জড়ান।
যেভাবে হয় টাকা উদ্ধার
গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর জোনাল টিমের এডিসি সাইফুল ইসলাম সাঈফ বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খিলক্ষেত এলাকায় একটি কালো রঙয়ের মাইক্রোবাস উদ্ধার করি। ওই গাড়িতে থাকা তিনটি ট্রাঙ্ক উদ্ধার করা হয়। যা গণনা করে ডাকাতির ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা মিলে। পরে দক্ষিণখানের একটি বাসার বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে সাত লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন: সিসি টিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানতে পারি, বনানী থেকে হেঁটে হেঁটে কুর্মিটোলা এসেছিল ডাকাতরা। সানোয়ার হাসান নামে ডাকাত দলের এক সদস্যকে প্রথম শনাক্ত করা হয়। তার বনানীর বাসায় অভিযান পরিচালনা করে উদ্ধার করা হয় এক কোটি ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৫০০ টাকা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বনানী সুপার মার্কেট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ইমন ওরফে মিলনকে। তার জোয়ার সাহারার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা। একই দিনে সুনামগঞ্জ থেকে আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
১৩ মার্চ সানোয়ার ও বদরুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গুলশান কড়াইল বস্তির বউ বাজারে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ডাকাতিতে জড়িত আরেক সদস্য হৃদয়কে। উদ্ধার করা হয় ৪৮ লাখ ৭ হাজার টাকা। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১০ লাখ টাকাসহ নেত্রকোণা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মিলন মিয়াকে।

১৪ মার্চ খুলনা সিঅ্যান্ডবি কলোনি থেকে আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। আকাশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতির টাকায় কেনা একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এরপর ১৭ মার্চ সাভারের হেমায়েতপুরে অভিযান পরিচালনা করে গ্রেপ্তার করা হয় সোহেল রানাকে। সেই বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় লুট করা ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এরপর গত ৩০ মার্চ গোপালগঞ্জের কাজলীয়ায় অভিযান পরিচালনা করে ডাকাত দলের আরেক সদস্য হাবিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। লুকিয়ে রাখা মোট ১১ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।
গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের দাবি, বদরুল আলম, মিজানুর রহমান, সনাই মিয়া ও এনামুল হক বাদশা নামে গ্রেপ্তার চারজনের কাছ থেকে একটি টাকাও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারা মূলত ভাড়াটিয়া হিসেবে এসেছিলেন। টাকা ভাগ বাটোয়ারার আগেই তারা ধরা পড়েন।
বাকি ৩ কোটি টাকা উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযানে ডিবি
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এই ডাকাতির ঘটনায় আমরা ৮০ শতাংশ টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি তিন কোটি টাকা উদ্ধারে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি ডাকাতির ঘটনায় জড়িত জনি, মোস্তফা ও হিমন নামে আরও তিন ডাকাতকে গ্রেপ্তারের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।
এদিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা থেকে উদ্ধার ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা মানি প্ল্যান্ট লিমিটেডের জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গত ৯ মার্চ মিরপুর ডিওএইচএস থেকে সিকিউরিটি কোম্পানি মানি প্ল্যান্টের গাড়িতে করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সাভারের ইপিজেড বুথে ১১ কোটি ২৫ লাখ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। পথে তুরাগের হরিরামপুরে একদল ডাকাত মাইক্রোবাসে এসে ওই গাড়ির গতিরোধ করে। এরপর গাড়িতে থাকা লোকজনকে চড়-থাপ্পড় ও ঘুষি মেরে টাকাভর্তি চারটি ট্রাংক ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় মানি প্ল্যান্টের পরিচালক আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ডাকাতদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।







