একদিকে যখন গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে, যার বেশিরভাগই নারী ও শিশু, এবং বিশ্বজুড়ে গণহত্যার অভিযোগ তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই ইসরায়েলের একজন ভাষ্যকার ইরানে কাল্পনিক এক সফল সামরিক অভিযানের পেছনে ‘ঈশ্বরের হাত’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
মাইকেল ফ্রেউন্ড নামের এই লেখক ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এ প্রকাশিত এক মতামত কলামে এই দাবি করেন। তার এই লেখা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নিয়ে বিশ্ব বিবেক স্তব্ধ।
মাইকেল ফ্রেউন্ড তার কলামে একটি কাল্পনিক ভবিষ্যতের কথা বলেছেন, যেখানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো, যেমন—ফোরডো, ইসফাহান ও নাতাঞ্জে সফল হামলা চালিয়েছে। তিনি এই সামরিক সাফল্যকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দক্ষতা বা মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ এর শক্তির চেয়েও বড় করে দেখছেন ‘সৃষ্টিকর্তার হস্তক্ষেপ’ হিসেবে।
ফ্রেউন্ডের মতে, প্রতিটি আয়রন ডোমের প্রতিরোধ, প্রতিটি স্টিলথ বোমারু বিমানের আক্রমণ বা শত্রু দেশের গভীরে চালানো প্রতিটি গোপন অভিযানের পিছনে একটি ঐশ্বরিক শক্তি কাজ করে।” তিনি তার লেখায় বাইবেলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, রথ বা ঘোড়ার ওপর আস্থা না রেখে ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাসই ইহুদি জাতিকে বারবার রক্ষা করেছে। তার মতে, ইরানের বিরুদ্ধে এই কাল্পনিক বিজয়ও কোনো সাধারণ সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি ছিল “পরিত্রাণ”।
এই মতামতে ফ্রেউন্ড যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঈশ্বরভক্তির প্রশংসাও করেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন, সামরিক শক্তিকে পূজা না করে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাই ইসরায়েলের মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত।
তবে ফ্রেউন্ডের এই ‘ঐশ্বরিক বিজয়’-এর তত্ত্ব এমন এক কঠিন বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অবিরাম হামলায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার কর্মী এবং রাষ্ট্র গণহত্যার শামিল বলে আখ্যা দিয়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় নিহতের সংখ্যা এরই মধ্যে ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, নিহতদের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি নারী ও শিশু। বোমার আঘাতে হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির—কিছুই বাদ যায়নি। लाखों মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন এবং তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে ভুগছেন।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বইছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে নিজেদের সামরিক অভিযানকে ‘ঐশ্বরিক’ বলে দাবি করা এবং অন্যদিকে ফিলিস্তিনের বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানো—ইসরায়েলের এই দ্বিমুখী অবস্থান তাদের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
মাইকেল ফ্রেউন্ডের মতো ভাষ্যকাররা যখন প্রযুক্তি ও ঐশ্বরিক শক্তির মিশেলে সামরিক বিজয় উদযাপন করছেন, তখন ফিলিস্তিনের গাজায় মানবতা ভূলুণ্ঠিত। একদিকে কাল্পনিক সাফল্যের গৌরবগাঁথা, আর অন্যদিকে বাস্তবের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়—এই দুই চিত্র একসঙ্গে রেখে দেখলে বোঝা যায়, সংঘাতের বয়ান কতটা একপেশে এবং স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। বাংলাদেশি পাঠক এবং বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্নটি পরিষ্কার: একটি কথিত সামরিক বিজয় কি হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের রক্তের দাগ মুছে দিতে পারে?







