প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে জিনিসটা মুখে যায়, সেটি টুথপেস্ট। আর তেল ছাড়া দিনের কোনো বেলার রান্না হয় না। গবেষণা বলছে, এই দুই জিনিসেই রয়েছে প্লাস্টিকের গুঁড়া আছে।
ইএসডিও নামের একটি এনজিও গত ২৫ জুলাই এক গবেষণায় জানায়, বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। চারিদিকে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তথ্য প্রকাশের তিন দিনের মাথায় হাইকোর্ট তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এর কয়েক মাস আগে আরেক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, খোলা সয়াবিন তেলের প্রতি গ্রামে কণা আছে ৬৫টি। ওই খবরে টুথপেস্টের মতো অতোটা নড়াচড়া দেখা যায়নি।
প্লাস্টিক কণার হিসাবে তেলই অনেক এগিয়ে। তবু টুথপেস্ট নিয়েই বেশি কথা বলা দরকার। কেন, সেটাই এই লেখার বিষয়।
জিনিসটা কী
৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের টুকরাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে। এটা আমাদের কাছে দুইভাবে আসে।
একভাবে আসে ভেঙে। পলিথিন, মোড়ক, পাইপ, সিনথেটিক কাপড়, টায়ার, এসব রোদে-পানিতে ভাঙতে ভাঙতে ছোট হয় ও বাতাসে-পানিতে-মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ ইচ্ছা করে দেয় না, ঠেকানোও কঠিন।
আরেকভাবে আসে মিশিয়ে। কিছু পণ্যে উপাদান হিসেবে ছোট ছোট প্লাস্টিকের দানা মেশানো হয়। টুথপেস্ট, ফেসওয়াশ, স্ক্রাব। এটা ইচ্ছাকৃত, ঠেকানোও সহজ। শুধু নিয়ম করে দিলেই হয়।
টুথপেস্টের ব্যাপারটা দ্বিতীয় দলের। এই পার্থক্যটা মনে রাখলে বাকি সবটা বোঝা সহজ।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
কাজ হয়েছে গত এক বছর ধরে। দোকান, সুপারশপ ও পাইকারি বাজার থেকে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি নমুনা কেনা হয়। পরীক্ষা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে।

২৬টিতে কণা মিলেছে, প্রতি ১০০ গ্রামে ২০ থেকে ৩২০টি। সবচেয়ে বেশি মেডিপ্লাস ফ্লোরাইড জেলে, ৩২০টি। এটাই আবার জরিপে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ব্র্যান্ড।
দেশে তৈরি ২৫টি নমুনার ২২টিতেই কণা আছে। বিপরীতে ভারতের পাঁচটির মাত্র একটিতে।
শিশুদের ছয়টি টুথপেস্টের চারটিতে কণা পাওয়া গেছে।
আর আটটি নমুনায় কিছুই মেলেনি। এগুলো হলো প্যারোডন্ট্যাক্স এক্সপার্ট গাম কেয়ার, জেনফ্রেশ, প্যারাস্যুট জাস্ট ফর বেবি (ম্যাঙ্গো), সেনসোডাইন ফ্রেশ জেল, কোলগেট ম্যাক্সফ্রেশ, ক্লোজআপ রেড হট জিঙ্ক ফ্রেশ, কোডোমো (অরেঞ্জ) ও কোলগেট অ্যাকটিভ সল্ট।
তালিকায় আসল খবর
সংখ্যার দিকে তাকালে যা ধরা পড়ে না, তালিকার দিকে তাকালে সেটা ধরা পড়ে।
একই বাজারে, একই দামে, প্লাস্টিক ছাড়া টুথপেস্ট বানানো যায়। আটটি কোম্পানি বানিয়েছেও।
তাহলে বাকিরা কেন দেয়? ইএসডিওর মহাসচিব শাহরিয়ার হোসেনের অভিযোগ, কাঁচামালের খরচ কমাতে ইচ্ছা করেই দেওয়া হয়।
বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক মঞ্জুরুল করিমও বলেছেন, কম খরচে ওজন বাড়াতে কেউ কেউ এটা ব্যবহার করতে পারেন, যেটা খারাপ চর্চা। টুথপেস্টে যে ৪০টি উপাদান অনুমোদিত, মাইক্রোপ্লাস্টিক তার মধ্যে নেই।
কোম্পানিগুলোর জবাব কী? তারা বলেছে, এটা নিষিদ্ধ করে দেশে কোনো নিয়মই নেই। ইউনিলিভারের নয়টি নমুনার আটটিতে কণা মিলেছে, তারা গবেষণার পদ্ধতি সম্পর্কে আরও তথ্য চেয়েছে। স্কয়ারের ছয়টির সবগুলোতেই মিলেছে, তারা নিজেরা আবার পরীক্ষা করাচ্ছে।
কথাটা ঠিক, নিয়ম সত্যিই নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৫ সালের আইনে টুথপেস্টে প্লাস্টিকের দানা নিষিদ্ধ। ব্রিটেনে ২০১৮ সাল থেকে, কানাডাতেও। ইউরোপে ২০২৭ সালের পর এমন টুথপেস্ট আর বিক্রিই করা যাবে না। বাংলাদেশে এর কোনোটাই নেই।
এখন ক্ষতির হিসাব
সবচেয়ে দরকারি প্রশ্ন। এতে শরীরের কী হচ্ছে?
একটু হিসাব করা যাক। সবচেয়ে খারাপ নমুনায় প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০ কণা। মানে প্রতি গ্রামে ৩টির মতো। একবার দাঁত মাজতে পেস্ট লাগে এক গ্রামের কম, তার বেশির ভাগটাই কুলি করে ফেলে দেওয়া হয়।

তুলনাটা এবার শেষ করা যাক। খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি গ্রামে ৬৫ কণা, প্রায় বিশ গুণ বেশি। আর তেল আমরা দিনে ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম খাই। ফেলে দিই না।
অর্থাৎ টুথপেস্ট থেকে শরীরে যা যায়, খাবারের তুলনায় তা খুবই সামান্য।
বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টিস্ট্রি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত বলেছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ আছে ঠিকই, তবে আসল স্বাস্থ্যঝুঁকি জানতে আরও গবেষণা লাগবে। বিকল্প হিসেবে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের কথা আলোচনায় আছে, যদিও খরচের দিকটা দেখতে হবে। তার পরামর্শ, সরকার আগেভাগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিক, আর গবেষকরা তথ্য এমনভাবে দিন যাতে মানুষ সচেতন হয় কিন্তু অহেতুক আতঙ্ক না ছড়ায়।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন মনে করিয়ে দিয়েছেন, মাছ, মাংস ও সবজিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। তাই সমস্যাটা শুধু টুথপেস্টের নয়। তিনি বলেছেন, বড়রা ভালোভাবে কুলি করেন বলে তাদের ঝুঁকি কম। শিশুদের ক্ষেত্রে আলাদা, কারণ অনেক শিশু পেস্ট গিলে ফেলে।
আরেক দন্ত বিশেষজ্ঞ আরও সোজা বলেছেন, টুথপেস্টের কাজ ফ্লোরাইড দিয়ে দাঁতের ক্ষয় ঠেকানো। একটি গবেষণা দেখে দাঁত মাজা বন্ধ করার কোনো যুক্তি নেই।
তাহলে বিষয়টা নিয়ে এত কথা কেন? কারণ এটা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয়। দাঁত পরিষ্কারে প্লাস্টিকের কোনো ভূমিকা নেই। শিশুরা গিলে ফেলে। আর যা বেসিনে যায়, সেটাও শেষে নদীতেই যায়।
ক্ষতির মাত্রা কম বলে জিনিসটা থাকতে দিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
বাকি খাবারে কী অবস্থা
টুথপেস্টই একমাত্র জায়গা নয়। গত তিন বছরে দেশের গবেষকরা যা পেয়েছেন:
- তেল: খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি গ্রামে প্রায় ৬৫ কণা, বোতলজাত ব্র্যান্ডে ৫২
- দুধ: প্রতি ১০০ মিলিলিটারে ৭০ থেকে ১৫৬ কণা
- গুঁড়ো দুধ: প্রতি কেজিতে গড়ে ২৭৯
- আটা: প্রতি কেজিতে সাড়ে চার হাজারের বেশি, খোলা আটায় আরও বেশি
- লবণ: প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৭২
- বোতলের পানি: প্রতি লিটারে ৩৫
সংখ্যাগুলো বড় দেখাচ্ছে। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখা দরকার। এই কণাগুলো ওজনে প্রায় কিছুই নয়। আর কত পরিমাণে গেলে ক্ষতি হয়, সেই সীমাটা দুনিয়ার কোনো সংস্থাই এখনো ঠিক করতে পারেনি। তাই ‘৬৫ কণা’ শুনে সেটা বিপজ্জনক কি না, এখনই বলার উপায় নেই।
কণা গোনা আর ক্ষতি মাপা এক জিনিস নয়।
যেসব কথা বিশ্বাস করবেন না
‘সপ্তাহে একটা ক্রেডিট কার্ডের সমান প্লাস্টিক খাচ্ছি।’ এটা ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ঘোরে। কথাটা ঠিক নয়। ২০১৯ সালের এক হিসাবে সীমা ছিল সপ্তাহে ০.১ থেকে ৫ গ্রাম, প্রচারে গেল সবচেয়ে বড় সংখ্যাটা। পরে অন্য গবেষকরা দেখান, ওই হিসাবে গুরুতর ভুল আছে। আরেক হিসাবে দৈনিক পরিমাণ পাওয়া গেছে ৫৮৩ ন্যানোগ্রাম, যা ৫ গ্রামের ধারেকাছেও নয়।
‘অমুক ব্র্যান্ড নিরাপদ, তমুকটা নয়।’ খাবারের ক্ষেত্রে এটা বলার মতো তথ্য কারও হাতে নেই। দুধ নিয়ে দুই বছরের দুই গবেষণার ফলই একে অন্যের উল্টো এসেছে, কারণ পরীক্ষার পদ্ধতি আলাদা। এক নমুনার সঙ্গে আরেক নমুনার পার্থক্যও বিশাল।
‘প্লাস্টিকের বোতল মানেই বেশি খারাপ।’ কোমল পানীয়ের গবেষণায় সবচেয়ে বেশি কণা পাওয়া গেছে কাচের বোতলে, পেট বোতলে সবচেয়ে কম।
‘দুধ-তেল খাওয়া বন্ধ করে দিই।’ এটা করলে পুষ্টির ক্ষতি নিশ্চিত। আর মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি অনিশ্চিত। হিসাবটা মিলছে না।
ঘরে যা করতে পারেন
- পানি ফুটিয়ে ছেঁকে নিন। পাঁচ মিনিট ফোটালে খনিজ জমে কণাগুলো আটকে ফেলে। এরপর ছেঁকে নিলে বড় অংশ সরে যায়। বোতলের পানির চেয়ে ফোটানো পানিতে কণা অনেক কম।
- গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না। গরম হলে প্লাস্টিক থেকে কণা বেশি ছাড়ে। কাচ, স্টিল বা মাটির পাত্র ভালো।
- কাটাকুটির বোর্ড ও চামচ কাঠ বা স্টিলের নিন। আঁচড় পড়া প্লাস্টিকের বোর্ড থেকে কণা ছড়ায় বেশি।
- ঘরের ধুলা নিয়মিত পরিষ্কার করুন। সিনথেটিক কাপড় ও আসবাব থেকে ঘরের বাতাসে কণা মেশে।
- শিশুর টুথপেস্টে একবার চোখ বোলান। ছোট বাচ্চা কুলি করতে না পারলে পুরোটাই গিলে ফেলে। তবে পরিমাণ যেহেতু ছোট, ফ্লোরাইড ছেড়ে দেওয়ার দরকার নেই।
যা সরকারের করার কথা
টুথপেস্ট ও প্রসাধনীতে ইচ্ছা করে প্লাস্টিক মেশানো নিষিদ্ধ করা। কাজটা কঠিন নয়, বহু দেশ এক দশক আগেই করেছে।
মোড়কে উপাদান লেখা বাধ্যতামূলক করা। এখন কোনো টুথপেস্টের গায়েই এই তথ্য নেই।
খাবার পরীক্ষার জন্য ল্যাব ও নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা রাখা, শুধু আদালতের নির্দেশ এলে নয়।
আর ২০০২ সালে করা পলিথিন নিষেধাজ্ঞাটা কাগজে না রেখে কার্যকর করা। মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় উৎসই তো ওই পলিথিন।
শেষ কথা
মাইক্রোপ্লাস্টিক আমাদের খাবারে আছে, টুথপেস্টেও আছে। এটা আর সন্দেহের বিষয় নয়।
কতটা ক্ষতি করছে, সেটা এখনো কেউ জানে না। জানা নেই মানে ক্ষতি নেই, তা নয়। আবার জানা নেই মানে সর্বনাশ হয়ে গেছে, সেটাও নয়।
আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যেখানে উত্তরটা আগে থেকেই জানা, সেখানে অপেক্ষা করারও কিছু নেই। টুথপেস্টে প্লাস্টিক মেশানোর দরকার নেই, এটা প্রমাণ করতে আটটি নমুনাই যথেষ্ট।







