সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের প্রেমের ফাঁদে ফেলার অভিযোগে রাজধানীর ধানমণ্ডি থানায় দায়ের করা প্রতারণার মামলায় মডেল মেঘনা আলমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাকে আদালতে হাজির করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী শুনানিতে বলেন, ‘এই আসামিরা অভিনব কৌশল অবলম্বন করে বিদেশি রাষ্ট্রদূতসহ অ্যাম্বাসিগুলোতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের হানি ট্র্যাপে ফেলে বিপুল অর্থ বাগিয়ে নেওয়ার জন্য চক্র দাঁড় করিয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতারণা করে আসছেন। সবশেষ সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন এবং তার কাছ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’
এরপর বিচারক আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আছেন কিনা জানতে চান। মেঘনা আলম আদালতকে বলেন, ‘আমাদের কোনো আইনজীবী নেই। এরপর তিনি কথা বলতে অনুমতি চান।
আদালত অনুমতি দিলে তিনি বলেন,সৌদি রাষ্ট্রদূতের কথা বলা হচ্ছে। আমার প্রশ্ন যে কেউ চাইলে কি সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতে পারে? আপনারা কি তার কাছে যেতে পারবেন?
এ পর্যায়ে বিচারক তাকে থামিয়ে মামলা সম্পর্কে কিছু বলার আছে কিনা জানতে চান। এরপর মেঘনা বলেন, আমাকে বিনা বিচারে জেলে পাঠানো হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে কোনো আইনজীবী পাবেন না। বিষয়টি হলো রাষ্ট্রদূত ঈসার সঙ্গে আমার একমাত্র সম্পর্ক, আর কারও সঙ্গে না। সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। ঈসা অভিযোগ করেন আমি নাকি তার বাচ্চা নষ্ট করে ফেলেছি। এটা মোটেও সত্য না। এ বিষয়ে আমি ঈসার সঙ্গে কথা বলি। তাকে এসব তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলি। এসব বিষয় নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজি শফিকুরের সঙ্গে কথা বলি। এরপরেই পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে।’
এদিকে মেঘনার সহযোগী দেওয়ান সমির আদালতকে বলেন, ‘আমাকে মেঘনা আলমের বয়ফ্রেন্ড বলা হচ্ছে। এটা ভুল তথ্য, তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি সাধারণ একজন মানুষ। দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলাম। আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আমি মামলার এসব ঘটনার কিছুই জানি না।’
এরপর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম মিয়া তাদের দুইজনকে গ্রেপ্তার দেখান। একইসঙ্গে দেওয়ান সমিরের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এজলাস থেকে হাজতখানায় যাওয়ার পথে মেঘনা আলম বলেন, ‘একমাত্র ঈসার সঙ্গে আমার সম্পর্ক, আর কারো সঙ্গে সম্পর্ক নেই। আমি ন্যায়বিচার পাচ্ছি না।’ এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে ঘিরে ধরেন।
এর আগে, ভাটারা থানায় করা আরেক চাঁদাবাজির মামলায় ১১ এপ্রিল গ্রেপ্তার হন দেওয়ান সমির। ওই মামলায় তিনি বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন।
১০ এপ্রিল রাতে ডিবি পুলিশ মেঘনাকে রাজধানীর বসুন্ধরার বাসা থেকে আটক করে। পরদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ৩০ দিনের আটকাদেশে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে আটকের কারণ স্পষ্ট না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
মেঘনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্ন, ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটানোর চেষ্টা এবং দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গত রোববার (১৩ এপ্রিল) আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রেস ব্রিফংয়ে স্বীকার করে বলেন, মেঘনার আটক প্রক্রিয়া সঠিক হয়নি।
সেদিনই, মেঘনাকে আটকের প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধানের পদ থেকে রেজাউল করিম মল্লিককে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাকে সংযুক্ত করা হয় ডিএমপি সদর দপ্তরে।
রোববারই মেঘনার বাবা বদরুল আলম রিট করলে আদালত তা আমলে নেয়। আদালত জানতে চেয়েছে, পরোয়ানা ছাড়া আটক, গ্রেপ্তারের কারণ না জানানো, ২৪ ঘণ্টার বেশি হেফাজতে রাখা ও আইনজীবী না পাওয়ার সুযোগ কেন বেআইনি নয়। পাশাপাশি বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশের আইনগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
মামলার পরবর্তী শুনানির অপেক্ষায় আছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবশেষ, মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) প্রচলিত আইনেই মডেল মেঘনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী। মেঘনাকে আটকের ঘটানাটি ‘বেআইনি কোনো পদক্ষেপ নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে দেখা দেয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।








