চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এপ্রিল থেকেই শুরু হয় বিস্তৃত টিকা কার্যক্রম। এরপর চার মাস অতিবাহিত হলেও হামের সংক্রমণ ও শিশুমৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। গ্যাভি সমর্থিত আন্তর্জাতিক পর্যালোচনা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে শীর্ষস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সংবাদ মাধ্যম বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বনিক বার্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামে আক্রান্তের সংখ্যা, শিশু মৃত্যু আর উদ্বিগ্ন অভিভাবকের মুখ এখন সাধারণ চিত্র হয়ে উঠেছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে নীতিগত পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সংকট এবং টিকাদানের সার্বিক কাভারেজ কমে যাওয়াকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে টিকা সংরক্ষণ পদ্ধতি ও অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে হার্ড ইমিউনিটি অত্যাবশ্যকীয় একটি ব্যবস্থা। একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে যদি নির্দিষ্ট অনুপাতে ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া যায়, তাহলে ওই কমিউনিটিতে সেই নির্দিষ্ট রোগের আর সংক্রমণ হয় না। এ ব্যবস্থাই হার্ড ইমিউনিটি নামে পরিচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময় দেশে হামের বিরুদ্ধে হার্ড ইমিউনিটি ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ। কিন্তু গত দুই থেকে তিন বছরে সেটি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে এ বছর সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে এবং অনেক শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে গেছে।”বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, হামের সংক্রমণ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) পরিচালিত এবং গ্যাভি সমর্থিত সরাসরি টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকা সংগ্রহ করত। কিন্তু ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার নিয়মিত টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। এর ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব সৃষ্টি হয় এবং নিয়মিত টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদাররা তখন উদ্বেগ জানিয়েছিল যে এভাবে টিকা ক্রয়প্রক্রিয়া ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতি বছর সাধারণত প্রায় সাত কোটি ডোজ টিকা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে ইউনিসেফের প্রি-ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ ডোজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। টিকার এ ঘাটতির পাশাপাশি ২০২৪ সালের শেষদিকে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকা জাতীয় হাম টিকাদান অভিযানও বারবার পিছিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। এর ফলে লাখ লাখ শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা থেকে বঞ্চিত হয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ইউনিসেফ ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চলতি বছরের মার্চে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বাতিলের নির্দেশ দেয়। এরপর এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৮৬০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময় সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৮ জনে এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামের রোগী ১৬ হাজার ৭৪০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ছয় শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে এবং নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৮১৮ জন।
অন্যদিকে, ডব্লিউএইচওর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে নথিভুক্ত হামের ঘটনা অন্তত ৪২ হাজার ৭৮০টি (১৪ জুলাই পর্যন্ত)। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগ শনাক্তকরণ ও তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরো বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৬ সালে ১৪ জুলাই পর্যন্ত হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৭৩৫। সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ২৪৪ জন।
দেশের হাম পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাতে চাইলে গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে হামের টিকাদান কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হামে মৃত্যুর ৯৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, ৫৬ শতাংশ নয় মাসের কম এবং ২২ শতাংশ ছয় মাসেরও কম বয়সী। একই সঙ্গে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরাও এখন আক্রান্ত হচ্ছে। তাই শুধু বয়সের গতানুগতিক ছকে আটকে না থেকে আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে টিকাদানের নতুন লক্ষ্যগোষ্ঠী নির্ধারণ করতে হবে।’”
তিনি আরো বলেন, ‘জিরো-ডোজ শিশুদের দ্রুত চিহ্নিত করা এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা ও উপজেলাগুলোতে শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টিকা দেয়ার বয়সসীমা বাড়ানো হলে সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের মজুদ ও আগাম কৌশল তৈরি করা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়ায় শুধু সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এবং পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। ১০ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ শতাংশ এবং কর্মসূচি শেষে ১০৩ শতাংশ ‘কাভারেজ’ অর্জনের দাবি করা হয়। তবে জাতিসংঘের জুন মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৪টি জেলাতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্তদের ৮০ শতাংশেরই বয়স পাঁচ বছরের কম এবং মোট আক্রান্তের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স নয় মাসের কম—অর্থাৎ নিয়মিত টিকা নেয়ার বয়স হওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে ভ্যাকসিনের গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। তারা জানিয়েছেন, “হামের টিকা তাপমাত্রা সংবেদনশীল। এটি ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। গ্রামাঞ্চলে সংরক্ষণ এবং টিকা দেয়ার সময় এ তাপমাত্রা সবসময় নিশ্চিত করা যাচ্ছে কিনা তা নিয়ে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দপ্তরের আঞ্চলিক উপদেষ্টা এবং ডিজিএইচএসের সাবেক পরিচালক ড. আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দুটি বিষয়ের দিকে নজর দেয়া সবচেয়ে জরুরি—টিকার কার্যকারিতা এবং প্রান্তিক অঞ্চলে পরিবহনের সময় “কোল্ড চেইন” বজায় থাকছে কিনা। যেহেতু হামের ভাইরাসের ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে, তাই ব্যবহৃত টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে একটি নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন।’”
বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহিদ রায়হান বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে বিশেষ ‘মপ-আপ’ প্রোগ্রাম চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের কঠোরভাবে রোগীদের হিস্ট্রি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নিউমোনিয়া নিয়ে আসা শিশুদের ক্ষেত্রে আগে জ্বর বা র্যাশ ছিল কিনা তা জানতে বলা হয়েছে। আক্রান্তদের অধিকাংশই জিরো-ভ্যাকসিনেটেড। ২০২০ সালের পর দেশে বড় কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি, তাই এবার আমরা সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন শিশুরা টিকার আওতায় না আসা পর্যন্ত অর্জিত ইমিউনিটি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
হামের সঙ্গে ‘অ্যাডেনোভাইরাস’ সংক্রমণের বিষয়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের সঙ্গে অ্যাডেনোভাইরাসের বিষয়টি আসায় আমি ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপকে বিষয়টির কারিগরি দিক খতিয়ে দেখতে বলেছি। কারিগরি কমিটি যে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেবে, সেই অনুযায়ী সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’







