বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচির একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কোটি কোটি শিশুকে জীবনরক্ষাকারী টিকার আওতায় এনেছে এবং হাম, পোলিওসহ বহু সংক্রামক রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হাম সংক্রমণ এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। টিকার ঘাটতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অর্থায়ন সংকটে ইতোমধ্যে ৬০১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন প্ররিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এই বিপর্যয়ের দায় কার?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। হামের এই পুনরুত্থানকে শুধুমাত্র একটি টেন্ডার বিতর্ক, একটি মন্ত্রণালয়, একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা একজন কর্মকর্তার ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত, অবহেলা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার সম্মিলিত ফল। তবে সেই বাস্তবতা রাষ্ট্রের দায় কমায় না; বরং আরও স্পষ্ট করে।
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকার পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করাই দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ সরকারি নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিকা চাহিদার বাজেট চূড়ান্ত করা হয়েছে অর্থবছর শুরু হওয়ার পর। আরও উদ্বেগজনক হলো, যখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানতেন যে টিকার মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, ঠিক তখনও প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা সময়মতো নিশ্চিত করা হয়নি।
এখানে মূল ব্যর্থতা ছিল পরিকল্পনায়। সরকার এবং স্বাস্থ্য প্রশাসন এমন একটি অর্থের ওপর নির্ভর করেছিল, যা তখনও তাদের হাতে ছিল না। এশীয়ার উন্নয়ন ব্যাংকের অব্যবহৃত কোভিড-১৯ টিকা ঋণের অর্থ, সহজেই নিয়মিত টিকা কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে—এমন একটি অনুমানের ওপর পুরো পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থার বাস্তবতা হলো, কোনো অর্থের পুনর্বিন্যাস কখনোই স্বয়ংক্রিয় বা তাৎক্ষণিক হয় না। অনুমোদন, আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক যাচাইয়ের মতো ধাপগুলো সময়সাপেক্ষ। এমন একটি মৌলিক বিষয় বিবেচনায় না নেওয়া, কেবল প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি নীতিনির্ধারণী দূরদর্শিতারও ঘাটতি।
তবে দায়ের প্রশ্নে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ারও সুযোগ নেই। ইউনিসেফ এবং এডিবি উভয়েই পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত ছিল। এডিবি চার মাস সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, জরুরি চালান পাঠাতে তাদের ১৬ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন উঠতে পারে—একটি দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি যখন স্পষ্ট,, তখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দ্রুত ও নমনীয়ভাবে সাড়া দিতে পারত কি না। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা বা বিলম্ব বাংলাদেশের দায়কে আড়াল করতে পারে না। কারণ শেষ পর্যন্ত টিকা নিশ্চিত করার দায়িত্্ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জবাবদিহির অভাব। এত বড় বিপর্যয়ের পরও জনগণ এখনো স্পষ্টভাবে জানে না, কে কোথায় ভুল করেছেন। কেন বাজেট প্রণয়ন বিলম্বিত হলো? কেন বিকল্প অর্থায়ন আগে থেকে প্রস্তুত ছিল না? কেন সংকটের সতর্কবার্তাগুলো কার্যকর পদক্ষেপে রূপ নেয়নি? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। প্রশাসনিকের এমন পরিস্থিতির পর স্বাধীন তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দেখা যায়। বাংলাদেশে বরং দায়ের প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্কের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকট আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি বড় দুর্বলতাকে উন্মোচিত করেছে। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু যখন অর্থায়ন কাঠামো পরিবর্তিত হলো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন দেখা দিল, তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থা সেই চাপ সামলাতে পারেনি।
হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে অবশ্যই আরও কিছু কারণ ছিল। কোভিডকালীন সময়ে নিয়মিত টিকাদানের ব্যাঘাত, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকাবিরোধী প্রচারণা—সবই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। কিন্তু এসব কারণের কোনোটি টিকার ঘাটতির বাস্তবতাকে খণ্ডন করে না। বরং টিকার সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এই অন্যান্য ঝুঁকির অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।
সবশেষে, দায় কার —এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো শতকরা হারে নিরূপন সম্ভব নয়। কিন্তু এটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে দায়ের সবচেয়ে বড় অংশ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপরই বর্তায়। কারণ সংকটের সূচনা হয়েছিল পরিকল্পনার ব্যর্থতা থেকে, গভীর হয়েছিল সিদ্ধান্তহীনতায়, এবং ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলে।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। যদি টিকার ঘাটতির কারণে একজন শিশুও প্রাণ হারিয়ে থাকে, তবে সেটি একটি নীতিগত ব্যর্থতা। আর যদি সেই সংখ্যা কয়েক ডজন বা তারও বেশি হয়, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর নৈতিক ব্যর্থতা।
হাম সংক্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, তাই দায় এড়ানো নয়, দায় স্বীকার করা। কারণ যে রাষ্ট্র নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারে না, সে রাষ্ট্র একই ভুল আবারও করার ঝুঁকি বহন করে। আর জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সেই ভুলের মূল্য শেষ পর্যন্ত পরিশোধ করে শিশুরাই।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








