মুনাফাশিকারী অসাধু ব্যবসায়ী-আড়তদার-খুচরা বিক্রেতাদের হাতের ইশারায় যখন-তখন নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে আগুন ধরায় বলেই জনজীবনে নাভিশ্বাস আর জনপ্রত্যাশা সংকুচিত। কখনও ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা-খরা-উৎপাদন কম-অবরোধ-ইত্যাদির অজুহাতে দ্রব্যমূল্যের দাম আকাশ ছোয়া হয়ে যায়। তাই অন্তর্বর্তী সরকার ও কর্তৃপক্ষের নৈতিক দায়িত্ব দ্রুত নিত্যপণ্যের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরানোসহ আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা।
গত ২০ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের “বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির গতিশীলতা, এপ্রিল-জুন ২০২৪” প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা যায়, “ভোক্তার খরচ বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। এর বিপরীতে আয় বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। ভোক্তার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ। আয়ের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি বাড়ায় ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। দীর্ঘসময় আয় বৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থাকায় ভোক্তার জীবনযাত্রাকে নেতিবাচক ধারায় প্রভাবিত করেছে।” প্রতিবেদনে উল্লেখ, “বৈশ্বিক মন্দা শুরুর পর থেকে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বাড়তে থাকে। এর বিপরীতে আয় বাড়ার হার কমতে থাকে। ফলে আয় ও ব্যয় বাড়ার মধ্যকার ব্যবধানও বাড়তে থাকে।” প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ, “মূল্যস্ফীতির হার বাড়ায় অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকেও আঘাতের প্রবণতা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় এ হার চড়া থাকায় এর প্রভাব এখন দৃশ্যমান ও প্রকট হচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিট অতিক্রম করায় এ খাতে মানুষের খরচ বেড়েছে। মানুষ খাদ্যের পেছনে বেশি ব্যয় করে বলে খরচের মাত্রাও বেড়েছে।” মূল্যস্ফীতির গতিপথ নিয়ে এটি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি গবেষণাধর্মী ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন। অথচ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী মূল্যস্ফীতির হার আরও অনেক বেশি। বর্তমান সময়ে এই মূল্যস্ফীতির হার তার চেয়েও বেশি।
দেশে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য অসাধু অতিমুনাফালোভী ব্যবসায়িদের কারসাজিই যে দায়ী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগামের সিংহভাগই ব্যবসায়িদের নিয়ন্ত্রণে তা কেবল ব্যবসায়ি নেতৃবৃন্দরা বিভিন্ন সময় স্বীকারই করেননি, এ তথ্য সরকারি গবেষণাপত্রেও উঠে এসেছে। চাল-আলু-পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) বলেছে “সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতার কারণে চাল, আলু আর পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।” ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ, “সরকারের হাতে পর্যাপ্ত চালের মজুত ছিল না। তা ছিল মিলারদের হাতে। ফলে তারা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী চাল ছাড়েনি। সরকারের হাতে যদি পর্যাপ্ত চাল থাকত, তাহলে ওএমএসের মাধ্যমে বাজারে ছেড়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যেত। আলুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এটা তো সরকারের হাতে থাকে না। থাকে কোল্ডস্টোরেজ ও ব্যবসায়িদের কাছে। বন্যার কারণে যখন সবজি উৎপাদন ব্যাহত হয়, তখন আলুর ওপর চাপ পড়ে। আলুর চাহিদা যখন বেড়ে যায়, তখন কোল্ডস্টোরেজ থেকে পর্যাপ্ত আলু বাজারে ছাড়া হয়নি। অথচ সাড়ে তিন লাখ টন উদ্বৃত্ত আলু আমাদের রয়েছে। এখানেও সরকার ব্যবসায়িদের সঙ্গে আলোচনা করে আলু বাজারে আনতে পারেনি। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি আছে। কিন্তু ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় বাজারে সংকট তৈরি হয়। তখন অন্য জায়গা থেকে দ্রুত আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।” জনমানুষের জীবনধারণ কার্যত যেন আজ কিছু অসাধু ব্যবসায়ির উপর নির্ভর। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গত ৯ অক্টোবর বলেছেন, “অধৈর্য হবেন না, দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে।” অথচ তাঁর আশ্বাসের পরও সিংহভাগ পণ্যের দাম দ্রুত বেড়েছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ-বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা এবং পূর্বাভাস সেল-বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেল-খাদ্য অধিদপ্তর-ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ সরকারের একাধিক বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান। মাঝেমধ্যে বাজার পরিদর্শন, শহরাঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক কিছু অভিযান-জরিমানার নামই কি বাজার ব্যবস্থাপনা? কিছু বাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা টানিয়ে দেওয়ার নামই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ? অথচ অতিরিক্ত মুনাফাকারী-মজুদকারী-আড়তদার-সিন্ডিকেট-চাঁদাবাজ-খুচরা ব্যবসায়ি পর্যন্ত যারা নানা উপায়ে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে, তাদের প্রতিরোধে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন-পুরোনো কিছু আইন রয়েছে। যেমন প্রয়োজনীয় ধারা (মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মজুত বিরোধী) আইন ১৯৫৩; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬, অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যাদি নিয়ন্ত্রণ আদেশ ১৯৮১, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বিপণন ও পরিবেশক নিয়োগ আদেশ ২০১১ অন্যতম। এসব আইন এখন অনেকটাই ‘কাগজে কলমে’ আর নতুন আইনের মধ্যে আছে ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২০ অন্যতম। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন, আইনগুলো প্রয়োগ করা হয়েছে খুবই কম। এখনও গড়ে উঠেনি নেটওয়ার্ক আর নিশ্চিত করা যায়নি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োগকারী সংস্থা। জনবল আর সক্ষমতা নিয়েও আছে জনমনে নানা প্রশ্ন। দ্রব্যমূল্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণে এত আইন থাকার পরও দেশজুড়ে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ির দৌরাত্ম্য। সরকার যদি অভাগা দেশের সংবিধান মানেন, তাহলে সংবিধানের রক্ষক হিসাবে জনমানুষের ‘জীবনে’র নিশ্চয়তা দিতে বাধ্য। একইভাবে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় অপরিহার্য খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। সরকারের এখন জাতীয় স্বার্থে দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরাই হবে অসহায় জনমানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ‘অর্থবহ সংস্কার’। কারণ জনমানুষ সুবিধাভোগী ব্যবসায়ির দ্বারা বৈষ্যমের স্বীকার।
তাই জনমানুষের প্রত্যাশা সরকার ও প্রশাসন দিবে না কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর আশ্রয় নিবে না প্রতারণার। তাদের আরও প্রত্যাশা শাসকগণও বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আজ্ঞাবহ না হয়ে সর্বদাই থাকবে জনমানুষের সেবায় নিয়োজিত। যা বাংলাদেশের সংবিধানের ২১-দফার ২-অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।” শাসকগণকে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে এদেশের প্রকৃত মালিক জনমানুষ। এই জনমানুষের আদালতেই সরকারের নীতি-আদর্শ-কর্মের বিচার হয়। পৃথিবীর কোথাও শাসকগণ এ সুবিধা পায় না যে জনমানুষ দুটো মিষ্টি কথাতেই সন্তুষ্ট। এদেশের জনমানুষের জীবন-চাহিদা অতি অল্প; ব্যাপক জনগোষ্ঠী তিনবেলা তিনমুঠো অন্নে সন্তুষ্ট; জনমানুষ একটু শান্তি নিদ্রা আর জান-মালের নিরাপত্তারসহ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকার চেয়ে শাসকগণের কাছে এর বেশি কিছু আশা করে না। তাই জাতীয় স্বার্থেই জনমানুষের প্রত্যাশা বাজার নিয়ন্ত্রণ আর আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন। এই সরকার যদি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে না পারে তাহলে তার মাশুল দিতে হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







