এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দেশের রাজনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরকারের সংযোগ স্থাপন করে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে এবং সেবা প্রদান করে। তবে স্থানীয় সরকারগুলোর কার্যকারিতা অনেকাংশে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের সক্ষমতা এবং স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করে। উন্নয়নশীল দেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর ও স্বনির্ভর করে তুলতে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখন দেখা যাক বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর বাস্তব চিত্র। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর (সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ ইত্যাদি) কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা তাদের কার্যকারিতা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারের উপর নির্ভরতা একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। স্থানীয় সরকারগুলোকে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নির্ভর করতে হয়, যার ফলে স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে স্বায়ত্তশাসন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্রুততার অভাব দেখা দেয়। এই নির্ভরতার কারণে স্থানীয় সরকাররা জনগণের চাহিদা ও সমস্যা সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেনা, যার ফলে উন্নয়নের গতি কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক স্বনির্ভরতার অভাব স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য একটি গুরুতর বাধা। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে সক্ষম না, এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল থাকার কারণে তাদের উন্নয়ন কার্যক্রম প্রায়শই স্থবির হয়ে যায়। বিশেষ করে, স্থানীয় কর এবং ফি আদায়ের জন্য দক্ষতার অভাব ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই আর্থিক সংকটের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক উন্নয়ন এবং অন্যান্য মৌলিক সেবায় যথাযথ পরিব্যপ্তি ও মান কমে যায়।

পাশাপাশি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা স্থানীয় সরকারগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাধা সৃষ্টি করছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটে, যা জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। প্রশাসনিক অদক্ষতার ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরগতিতে হয় এবং এটি স্থানীয় জনগণের জন্য সেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলো এছাড়া, জনপ্রতিনিধিদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের অভাব একটি আরেকটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা তাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। ফলে, তারা জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না, যা স্থানীয় সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করে।
অধিকন্তু, সমন্বয়ের অভাব স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় না। এই সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কার্যকরী সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শিক্ষাও কাজে লাগানো প্রয়োজন। সবার আগে স্থানীয় সরকারগুলোকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা দিতে হবে।
এছাড়াও, স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতের পঞ্চায়েত রাজ ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারগুলোকে বিভিন্ন ক্ষমতা এবং সম্পদ প্রদান করা হয়েছে। এটি স্থানীয় মানুষের নিকট সরকারের কার্যক্রমকে আরও বেশি স্বচ্ছ এবং উন্মুক্ত করেছে।
গ্রামীণ এলাকার উন্নয়ন, যেমন পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সড়ক নির্মাণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের এই ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে এবং জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি, ব্রাজিলের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি উদাহরণ। সেখানে মিউনিসিপাল কর্পোরেশন স্থানীয় জনগণের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বিভিন্ন সেবা প্রদান করে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
আর্থিক স্বনির্ভরতা স্থানীয় সরকার কার্যকর করার অন্যতম হাতিয়ার। উদাহরণসরূপ, দক্ষিণ কোরিয়া স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য মিউনিসিপাল ফান্ড প্রতিষ্ঠা করেছে, যা স্থানীয় সরকারগুলোকে তাদের নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অর্থায়ন পেতে সাহায্য করে। এই ফান্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারগুলো স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারে এবং সরকারি সেবা প্রদানে গতি আনতে পারে।

এছাড়া, কেনিয়া তার কনস্টিটিউশনাল ডেভোলিউশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজেটের একটি অংশ স্থানীয় সরকারের কাছে বরাদ্দ করেছে। এর ফলে, স্থানীয় সরকারগুলো তাদের স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে সেবা প্রদান করতে পারে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া উচিত। যেমন, স্থানীয় কর (যেমন ভূমি কর, ব্যবসা কর) সংগ্রহের জন্য নতুন নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়াও, স্থানীয় সরকারের জন্য মিউনিসিপাল ফান্ড প্রতিষ্ঠা করে তাদের আয় বাড়ানোর জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
সুশাসন ও স্বচ্ছতা ছাড়া স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কার্যকর করা অসম্ভব। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ই-গভর্নেন্সের প্রবর্তন করা উচিত। এটি স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে। সেই সাথে কার্যক্রমের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা দরকার। এস্তোনিয়া বিশ্বের অন্যতম সফল ই-গভর্নেন্স মডেল হিসেবে পরিচিত। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার সেবা প্রদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে জনগণ অনলাইনে সেবা গ্রহণ করতে পারে এবং প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে এস্তোনিয়ার মডেল বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে
জন্য সহজলভ্য করা দরকার। এস্তোনিয়া বিশ্বের অন্যতম সফল ই-গভর্নেন্স মডেল হিসেবে পরিচিত। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার সেবা প্রদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে। এর মাধ্যমে জনগণ অনলাইনে সেবা গ্রহণ করতে পারে এবং প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে এস্তোনিয়ার মডেল বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে।
জার্মানি ও সুইডেনে স্থানীয় সরকারগুলোকে অর্থনৈতিক, সামাজিক, এবং পরিবেশগত ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতা স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং তাদের জনগণের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সেবা প্রদানে আরও কার্যকর করে তোলে। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন খাতে ক্ষমতা বৃদ্ধি করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং যুব উন্নয়নের মতো খাতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানো উচিত। এটি স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে তুলবে এবং জনগণের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করবে।
অধিকন্তু, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যঅর্জনে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া উচিত। স্থানীয় সরকারগুলোকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে, পরিবেশ সুরক্ষা, নারী উন্নয়ন, এবং দারিদ্র্য বিমোচনের মতো স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন খাতে ক্ষমতা বৃদ্ধি করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবেশ সুরক্ষা, দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং যুব উন্নয়নের মতো খাতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা বাড়ানো উচিত। এটি স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করে তুলবে এবং জনগণের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করবে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে। যুক্তরাজ্যে স্থানীয় সরকারগুলোকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভিন্ন পরিবেশগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে কর্মপন্থা গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বনির্ভরতা, সুশাসন, জনঅংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বৈশ্বিক উদাহরণগুলোর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও উদ্ভাবনী সমাধান গ্রহণ করা সম্ভব। স্থানীয় সরকারগুলোকে আরও ক্ষমতাশালী ও সক্ষম করে তুললে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। এজন্য সরকারের বিভিন্ন স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







