ইউরোপের অন্যতম ঐতিহাসিক ও রূপসী শহর পর্তুগালের রাজধানী লিসবন এখন উৎসবের নগরী। ১২ জুন, পর্তুগিজদের সবচেয়ে বড়, রঙিন এবং প্রাণের উৎসব—‘সান্তো আন্তোনিও’র (Festa de Santo António) মূল রাত।
প্রতি বছর এই দিনটিকে কেন্দ্র করে পুরো লিসবন শহর রূপ নেয় এক খোলা আকাশের নিচের বিশাল রঙ্গমঞ্চে। ২০২৬ সালের এই মহোৎসবে যোগ দিতে ইতোমধ্যে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লিসবনে আছড়ে পড়েছে লাখো পর্যটকের ঢল।
১২ জুন উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘মার্শাশ পপুলারেশ’ (Marchas Populares) বা ঐতিহ্যবাহী পাড়াভিত্তিক প্যারেড। রাত ৯টা বাজতেই লিসবনের প্রাণকেন্দ্র অ্যাভেনিডা ডা লিবেরদাদে (Avenida da Liberdade)-তে শুরু হয়েছে এই বর্ণাঢ্য মিছিল। আলফামা, মুরাদিয়া, বিঁকা থেকে শুরু করে লিসবনের ২০টিরও বেশি ঐতিহাসিক মহল্লার প্রতিযোগীরা রাতে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, গান এবং কোরিওগ্রাফি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন।
পর্তুগালের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিশেষ বছর উপলক্ষে এবারের উৎসবের মূল থিম নির্ধারণ করা হয়েছে—”A Europa em Lisboa” (লিসবনে ইউরোপ)। প্রতিটি মহল্লা এই থিমকে ধারণ করে আলোর রোশনাইয়ে ফুটিয়ে তুলছে তাদের পারফরম্যান্স।
ভালোলাগা আর ভালোবাসার সাধু সান্তো আন্তোনিওকে উৎসর্গ করে আজ দুপুরের দিকে সম্পন্ন হয়েছে উৎসবের অন্যতম আবেগঘন অংশ ‘সান্তো আন্তোনিওর বিয়ে’ (Casamentos de Santo António)। লিসবন সিটি কাউন্সিলের সম্পূর্ণ অর্থায়নে আজ ১৬টি স্থানীয় যুগলের রাজকীয় গণবিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি বিয়ে সিভিল কোর্টে এবং ১১টি বিয়ে ঐতিহাসিক সে ক্যাথেড্রাল (Sé de Lisboa)-এ ধর্মীয় রীতিতে অনুষ্ঠিত হয়। এই নবদম্পতিরাও আজ রাতের প্যারেডে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নিচ্ছেন।
প্যারেডের পাশাপাশি লিসবনের পুরনো ও ঐতিহাসিক পাড়াগুলোর কন্ডিশন এখন এককথায় উৎসবমুখর। আলফামা, গ্রাসা বা মায়াবী বিঁকার সরু গলিগুলো রঙিন কাগজের লণ্ঠন ও রিবনে সাজানো হয়েছে। চারিদিকে কয়লার আগুনে তাজা সার্ডিন মাছ (Sardinhas Assadas) গ্রিল করার মজে যাওয়া সুবাস এবং ঐতিহ্যবাহী ‘পিম্বা’ (Pimba) মিউজিকের তালে চলছে নাচ-গান।
পাশাপাশি, লিসবনের প্রতিটি কোণায় বিক্রি হচ্ছে ভালোবাসার প্রতীক তুলসী জাতীয় গাছ ‘মাঞ্জেরিকো’ (Manjerico)। ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকাকে ভালোবাসার কবিতা লিখে এই গাছের টব উপহার দিচ্ছেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে ১২ জুন বিকেল থেকেই লিসবনের কেন্দ্রস্থলের সমস্ত বাস ও ট্রাম চলাচল সীমিত করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের সুবিধার্থে লিসবন মেট্রো ওদিন সারারাত (২৪ ঘণ্টা) খোলা রাখার ঘোষণা দিয়েছে নগর প্রশাসন।
লিসবনের এই বিশাল আনন্দের জোয়ারে শামিল হয়েছেন স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। পর্তুগালে বসবাসরত বহু বাংলাদেশি পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে লিসবনের রাজপথে নেমেছেন পর্তুগিজ সংস্কৃতির এই অন্যতম সেরা রূপ উপভোগ করতে।
স্থানীয় প্রশাসন ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আজ এক রাতেই লিসবনের পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসা খাতে কোটি ইউরোর অর্থনৈতিক লেনদেন ঘটবে।







