তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তির পর বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের আস্থার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি এবং ওই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন বাতিল প্রশ্নে জারি করা রুল আংশিক যথাযথ (অ্যাবসোলুট) ঘোষণা করে দেয়া ঐতিহাসিক রায়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ দেন। এই রায়ের আদালত বলেন, সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য সব আইনই সংবিধানের নিরিখে হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে সংবিধানের অভিভাবক। যে কোনো আইনোর বৈধতা নিরূপন করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।
হাইকোর্ট আরও বলেন, সংবিধান কেবল অতীত ও বর্তমানকে নিরূপন করে না। এটা ভবিষ্যতেরও দিশারী। একইভাবে সংবিধান কেবল একটি দালিলিক বিষয় নয়, উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সংবিধান একটি জাতির ভিত্তি এবং মৌলিক নির্দেশকও। একই সঙ্গে তা বিকশমান এবং পরিবর্তনশীল।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বেলেন, সাংবিধানিক ও আইনগত পরিবর্তন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অনুযায়ী করতে হবে। সেজন্য আইন বিভাগকে অবারিত ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর মাধ্যমে আইন বিভাগ বা সংসদের ক্ষমতাকে সীমিত করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধীর মাধ্যমে মৌলিক কঠামোকে ধ্বংস করা হয়েছিল।
এছাড়া হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আপিল বিভাগের ত্রয়োদশ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একমাত্র গনভোটের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং মৌলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা যায়। গণতন্ত্র হচ্ছে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। গণতন্ত্র বিকশিত হয় একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মূল সংবিধানে না থাকলেও একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনের অভিপ্রায়ে ১৯৯৬ সালে তা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে এই ব্যবস্থাটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই অংশে পরিণত হয়েছে। কারণ, এই ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর বিগত তিনটি সংসদ নির্চান (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) জনগণের আস্থার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। এই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যে কারণে সর্বশেষ সরকারকে জনগণের আন্দোলনের মুখে বিতাড়িত হতে হয়েছে। সরকারকে বিতাড়িত করতে গিয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই না, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণের আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে একটি নতুন গণতন্ত্র, নতুন স্বাধীনতা নতুন বাংলাদেশ, যা একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
আজকের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার জাতীয় সংসদের। সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে বিধানগুলো সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। সংবিধানে চার মূলনীতি, নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোটদান, জাতির জনক, সাতই মার্চসহ কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয় সংসদের সিদ্ধান্তের জন্য ‘রেখে দিয়েছেন’ হাইকোর্ট।
তবে আজকের ঐতিহাসিক রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের এই ধারা দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক,৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বাতিল ঘোষণা করেছেন। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়েছে।
হাইকোর্টের তার রায়ে সংবিধানের ৭ক, ৭খ ও ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ বাতিল করেছেন। যেখানে ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ এবং ৭খ অনুচ্ছেদে মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা হয়েছে।
আলোচিত এই রিটের রুল শুনানিতে সুজনের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া। বিএনপির পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, বদরুদ্দোজা বাদল, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল। জামায়াতের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। ইনসানিয়াত বিপ্লব দলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুর রউফ ও ইশরাত হাসান। এছাড়া রুল শুনানিতে পক্ষভুক্ত হওয়া সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জুনায়েদ আহমেদ চৌধুরী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদ উদ্দিন। এদিকে আজ রায় ঘোষণার সময় পক্ষভুক্ত হওয়া আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালে সংবিধানের ওই সংশোধনী আনা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আইন ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়। ২০১১ সালের ৩ জুলাই এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বৈধতা নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি গত আগস্টে হাইকোর্টে রিট করেন। এই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।








