ঢাকায় পাকিস্তানি শিল্পীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় বেড়েছে। বড় কোনো কনসার্টের আয়োজনের কথা শোনা মাত্রই সেখানে পাকিস্তানি শিল্পীদের দেখা মিলছে। আয়োজকদের মতে, ঢাকার তরুণ দর্শকদের চাহিদা মেটানোর জন্য নিয়মিত এমন আয়োজন হচ্ছে।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, চলতি বছরে বেশ কয়েকটি বড় কনসার্ট শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। এতে শুধু আয়োজকদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না, দেশের ভাবমূর্তিও বিদেশি শিল্পীদের কাছে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংগীত ইভেন্ট সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকায় কনসার্টের আমন্ত্রণে পাকিস্তানি শিল্পীরা একের পর এক বাংলাদেশে এলেও শেষ মুহূর্তে কনসার্ট বাতিল বা স্থগিত হওয়া এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে! চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অন্তত তিন থেকে চারটি বড় কনসার্ট একইভাবে বাতিল হয়েছে— সবকটিতেই কারণ দেখানো হয়েছে নিরাপত্তাজনিত জটিলতা বা ভেন্যুর অনুমতি না পাওয়া।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে বলিউডের ‘তো ফির আও’ খ্যাত পাকিস্তানি শিল্পী মুস্তাফা জাহিদ ঢাকায় এসে রিহার্সালও করেন। কিন্তু কনসার্ট শুরুর মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় নিরাপত্তাজনিত কারণে কনসার্ট হচ্ছে না।
পরে স্থানীয় শিল্পীরা আয়োজকদের বিরুদ্ধে অসংগতি, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং পেমেন্ট না দেওয়ার অভিযোগ করেন। শত শত দর্শক টিকেট কিনেও ফেরত পাচ্ছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
গেল মাসের (নভেম্বর) মাঝামাঝিতে হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানি তারকা আলী আজমত ও বাংলাদেশের জেমস–এর সহযোগী কনসার্ট। তিন দিন আগে আজমত ঢাকায় এলেও কনসার্টের দিন সকালে আয়োজকদের ঘোষণা ‘দেশের চলমান অস্থিরতার কারণে অনুষ্ঠানটি স্থগিত।’
পরে রাতেই চূড়ান্তভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয় এই কনসার্ট। আয়োজকরা নিরাপত্তাহীনতাকে কারণ হিসেবে দেখান। টিকিট রিফান্ডের আশ্বাস দিলেও অনেকে বিষয়টিকে আয়োজকদের ‘সুস্পষ্ট ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেন। এসময় অনেকেই প্রশ্ন তুলেন, নিরাপত্তা এবং ভেন্যু জটিলতার বিষয়টি বিদেশি শিল্পীকে দেশে নিয়ে আসার আগেই কেন ঠিক করা হয় না? এ বিষয়গুলো নিশ্চিত না হয়ে কেন বিদেশি শিল্পীকে দেশে নিয়ে আসা হয়?
একই কাণ্ড আরো একবার দেখলো ঢাকা! শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিলো পাকিস্তানি ব্যান্ড কাভিশ এর ‘ওয়েভ ফেস্ট: ফিল দ্য উইন্টার’ কনসার্ট! সে হিসেবে বুধবার (৩ ডিসেম্বর) পাকিস্তানি ব্যান্ড কাভিশ ঢাকায় এসে পৌঁছায়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভেন্যুর অনুমতি মিলেনি বলে জানায় আয়োজক প্রাইম ওয়েভ কমিউনিকেশনস।
তাদের দাবি—ভেন্যু, কাগজপত্র, শিল্পীদের পারিশ্রমিকসহ সব প্রস্তুতি শেষ ছিল। কিন্তু দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে অনুষ্ঠানটি পুনঃনির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কাভিশও একটি ভিডিও বার্তায় ভক্তদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) রাতে আয়োজকরা এক বিবৃতি জানায়,“কাভিশ গতরাতেই ঢাকায় পৌঁছেছে। এর একমাত্র কারণ—যে কোনো মূল্যে আমরা এই শো সফলভাবে সম্পন্ন করতে চেয়েছিলাম। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি ও অস্থিতিশীলতা বিবেচনায়, প্রস্তুতি, ভেন্যু, কাগজপত্র, শিল্পীদের পেমেন্ট এবং অনুমতির সব জটিলতা অতিক্রম করার পরও দেশের বর্তমান অশান্ত পরিস্থিতি ঘিরে সংবেদনশীলতার কারণে আমাদের ‘ওয়েভফেস্ট সিজন ০১’ স্থগিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমরা হৃদয় থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি আয়োজনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”
এসময় বিবৃতি আরো জানানো হয়,“অনুষ্ঠানটি স্থগিত হয়েছে, বাতিল নয়- এটি দয়া করে মনে রাখবেন। আপনারা হতাশ হবেন না। এই অনিবার্য পরিস্থিতির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এছাড়া আপনাদের জানাতে চাই কাভিশ নিজেরাও আপনাদের জন্য একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছে, যা এখানে সংযুক্ত করা হলো। আবারও সকল অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। রিফান্ড নীতিমালা খুব শিগগিরই জানানো হবে।”
নিয়মিত একই ধরনের ঘটনার ফলে প্রশ্ন উঠছে ঢাকার কনসার্ট আয়োজন ব্যবস্থাপনা নিয়ে। টিকিট বিক্রি শুরু হয়, শিল্পীরা ঢাকায় এসে পৌঁছান, রিহার্সালও হয়ে যায় কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানানো হয়- ‘কনসার্ট হচ্ছে না’! এতে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা পোহান যারা টাকা দিয়ে অগ্রিম টিকেট ক্রয় করেন!
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া দেশের কনসার্ট ইন্ডাস্ট্রির জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এবং ভবিষ্যত আয়োজনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, এমন ঘটনা নিয়মিত হতে থাকলে দেশের শ্রোতা দর্শক হয়তো সামনে কোনো কনসার্টের অগ্রিম টিকেট কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে!








