বাংলাদেশ

ওএমএসে চাল-আটার বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান

ওএমএসে চাল-আটার বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খোলাবাজারে বিক্রয় (ওএমএস) কর্মসূচিতে চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি)। শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) এক প্রেস বিবৃতিতে সংগঠনটি এই আহ্বান জানায়।

খানির মতে, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ওএমএস কর্মসূচির বরাদ্দ কমানো হলে দরিদ্র মানুষের খাদ্য কেনার ব্যয় আরও বাড়বে এবং তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে ওএমএস কর্মসূচিতে চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আটা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন। গত অর্থবছরে চাল বিক্রি হয়েছিল ৩ লাখ ৪ হাজার টন এবং আটা ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন। সে হিসাবে চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২১ শতাংশ এবং আটার লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২২ শতাংশ কমানো হয়েছে। দুই পণ্য মিলিয়ে বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার টন।

একই সঙ্গে ওএমএস কর্মসূচির ভর্তুকি বরাদ্দ ৪ হাজার ৯৬ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ১৭ শতাংশ কম। অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে খাদ্য খাতে মোট ভর্তুকি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা।

খানি বলছে, ওএমএস মূলত শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি। অথচ নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

খানির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ ও সংশ্লিষ্ট গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২০১০ সালের ৭৪ লাখ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৭৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৩ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৫৩ লাখ হয়েছে। দেশের অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পায় না। শহরাঞ্চলে এ হার প্রায় ৬৪ শতাংশ।

গত ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস উপলক্ষে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নগরাঞ্চলের অনেক পরিবারকে ঋণ নিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, বিপরীতে গড় ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা।

এদিকে, সংগঠনটির উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আবাসন ও ইউটিলিটি খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং পরিবহন খাতে ৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

খানির তথ্য অনুযায়ী, ওএমএস কর্মসূচিতে প্রতি কেজি চাল বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। অন্যদিকে, বাজারে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা। ফলে ওএমএসের সুবিধা না পেলে একটি পরিবারকে প্রতি কেজি চালের জন্য অন্তত ২০ থেকে ২৫ টাকা বেশি খরচ করতে হতে পারে।

সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, চালের বরাদ্দ ৬৪ হাজার টন কমায় উপকারভোগী পরিবারগুলোর সম্মিলিত অতিরিক্ত ব্যয় আনুমানিক ১২৮ কোটি থেকে ১৬০ কোটি টাকা হতে পারে। আটার বরাদ্দ কমানোর প্রভাব বিবেচনায় নিলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে খানি।

খানির আশঙ্কা, খাদ্য কেনার ব্যয় বেড়ে গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাবারের পরিমাণ বা পুষ্টিমান কমাতে বাধ্য হতে পারে। এর প্রভাব শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্য ব্যয় মেটাতে পরিবারগুলোকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে হতে পারে। পাশাপাশি ঋণনির্ভরতাও বাড়তে পারে।

ওএমএস কর্মসূচি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতেও ভূমিকা রাখে বলে মনে করে খানি।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে রাজধানীর বাজারে মোটা ও মাঝারি চালের দাম কেজিপ্রতি এক থেকে দুই টাকা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি খাদ্য সরবরাহ কমানো হলে বাজারে মূল্যচাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

খাদ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওএমএসের বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত নয়। প্রয়োজনে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তহবিলও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এ অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে খানি বলেছে, বর্তমান মূল্য পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।

নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারটি সুপারিশ তুলে ধরেছে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক।

সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—ওএমএসে চাল ও আটা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা এবং ভর্তুকি বরাদ্দ অন্তত গত অর্থবছরের পর্যায়ে বহাল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় তা সমন্বয় করা।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও শিল্পাঞ্চলে, বিশেষ করে বস্তি ও শ্রমিক-অধ্যুষিত এলাকায় ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্য সুপারিশে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট নগর সামাজিক সুরক্ষা কৌশল প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সমন্বিত ও অধিকারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে খানি।

খানি বাংলাদেশের মতে, খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। অর্থনৈতিক ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

তাই খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির বরাদ্দ কমানোর পরিবর্তে তা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে ওএমএসে চাল ও আটার বরাদ্দ এবং ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক।

বিষয়:ওএমএস খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক খানি বাংলাদেশ ও পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি খানি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…