সদ্যপ্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার জানাজায় অংশ নিতে বাংলাদেশে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক। দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ওইদিন এই দুই নেতার করমর্দন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আজ (৫ জানুয়ারি) সোমবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জিও নিউজ জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) জনসমক্ষে আয়াজ সাদিকের সঙ্গে করমর্দন করেন এস জয়শঙ্কর। এটিই ছিল ২০২৫ সালের মে মাসের সামরিক সংঘাতের পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দৃশ্যমান উচ্চপর্যায়ের প্রথম সৌজন্য বিনিময়। করমর্দনের সময় জয়শঙ্কর নিজের পরিচয় দেন এবং বলেন, তিনি স্পিকার সাদিককে চিনতে পেরেছেন।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পটভূমি
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে এক হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। কোনো প্রমাণ না দিয়েই দিল্লি এই হামলার দায় ইসলামাবাদের ওপর চাপায়। পাকিস্তান এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে চার দিনব্যাপী (৮৭ ঘণ্টা) তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হয়, যা শেষ হয় ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। সংঘাতকালে পাকিস্তান ভারতের সাতটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করে, যার মধ্যে ফরাসি নির্মিত রাফালও ছিল বলে জানানো হয়।
একটি করমর্দন, মেলবন্ধনের ইঙ্গিত নয়
তবে এমন পরিস্থিতিতেও এই করমর্দনকে বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন না অনেকেই। বিখ্যাত পাকিস্তানি কূটনীতিক, জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা বলেন, এটি ছিল তাৎক্ষণিক ও অপ্রস্তুত একটি সৌজন্য বিনিময়, নীতিগত কোনো বার্তা নয়।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির সিনেটর ও সাবেক রাষ্ট্রদূত শেরি রহমানও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, এতে অতিরিক্ত অর্থ খোঁজা হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ফিরে আসা সবসময়ই ইতিবাচক।
ভারতের দৃষ্টিকোণ
ওয়াশিংটনভিত্তিক অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় করমর্দন না করা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে অশোভন হতো। এটি কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়। ভারত এখনও পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যদি দিল্লি সত্যিই সম্পর্ক উন্নয়নের সংকেত দিতে চাইত, তবে তা নীরব কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমেই দিত।
তবে সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হুসেইন সাইয়েদ করমর্দনটিকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তার মতে, শরীরী ভাষা ও হাসিমুখ দেখে বোঝা যায়, এটি পরিকল্পিত ছিল। ২০২৬ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরতে পারে।
একটি করমর্দন হয়তো তাৎক্ষণিক সৌজন্য, আবার কারও কাছে ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের ক্ষীণ ইঙ্গিত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এটুকুই স্পষ্ট যে, পাকিস্তান–ভারত সম্পর্ক এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে, আর এই করমর্দন সেই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।








